আজ আদালতে যা হয়েছে তা সবই অবৈধ!

0

‘গতকাল (মঙ্গলবার) সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন- এই বিশেষ আদালতে আমি যা করেছি, তার সবই অবৈধ। তাহলে আজ এই আদালতে সবই অবৈধ শুনানি হয়েছে।’ এমনটাই মন্তব্য করেছেন রাজধানীর তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার।

বুধবার দুদকের দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার চেয়ে করা আবেদনের শুনানি শেষে তিনি এ মন্তব্য করেন।

এর আগে খালেদা জিয়ার পক্ষে ৪টি পিটিশন দায়ের ও এর পক্ষে দীর্ঘ শুনানি করেন আইনজীবী এ জে মোহাম্মাদ আলী। এজলাশে বসার পর বিচারক আসামিরা কোথায় তা জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, ‘এই মামলার আসামিরা আসেননি। তারা সকলেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত। হাইকোর্ট থেকেও এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি। ফৌজদারী কার্যবিধিতে আসামির অনুপস্থিতিতে মামলা চালানোর কোনো এখতিয়ার নেই। আমরা সাক্ষী নিয়ে এসেছি। তাই পরবর্তী সাক্ষ্য চালানোর অনুমতি চাইছি।’

এ সময় বিচারক আসামিপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আসামির অনুপস্থিতিতে মামলা পরিচালনার কী বিধান আছে তাই বলুন?’

তখন আসামিপক্ষের আইনজীবী এ জে মোহাম্মাদ আলী বলেন, ‘খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে আমরা একটি প্রেয়ার (আবেদন) করেছি। আগামীকাল হাইকোর্টে এর শুনানি হবে বলে দিন ঠিক করা হয়েছে।’

‘কিন্তু এই আবেদনের কোনো জুরিসডিকশন (আইনি বিধান) আছে কি না’ বিচারকের এমন প্রশ্নে মোহাম্মাদ আলী বলেন, ‘আগে আমাকে বলার সুযোগ দিন, তারপর আপনি যা খুশি সিদ্ধান্ত নিন।’

মোহাম্মাদ আলীর এমন মন্তব্যে দুদকের আইনজীবীরা আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে বিতর্কে জাড়িয়ে যান। পরে বিচারক তাদেরকে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দেন।

এরপরই সুপ্রিমকোর্ট বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন দুদকের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা কি দাখিল করবো তা নিয়ে এতো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছেন কেন? আমরা চাই না এই মামলা নিয়ে কেউ মাল্টি বিজনেস করুক।’

এভাবে বাকবিতণ্ডার মধ্য দিয়ে মোহাম্মাদ আলী আবারো তার দীর্ঘ শুনানি শুরু করেন। বিচারক তখন তার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি বিস্তর না বলে লিগ্যাল পিটিশন নিয়ে আলোচনা করুন। এটা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় নয়। আপনি এখানে ক্লাস নিতে আসবেন না। আমাকে সবকিছু বিবিধ বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। শুধু ধারাগুলো উল্লেখ করুন।’

‘আপনাকে অবশ্যই বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন রয়েছে’ বলে মোহাম্মাদ আলী তার শুনানি অব্যাহত রাখেন। শুনানিকালে বিচারকের উদ্দেশে এ জে মোহাম্মাদ আলী বলেন, ‘আপনি বায়াস (পক্ষাবলম্বন) করে এই মামলা পরিচালনা করছেন। আপনি প্রভাবিত হয়ে মামলায় রুল দিয়েছেন। আপনি একটি পক্ষের হয়ে এই মামলায় কাজ করছেন। তাই আমরা আবেদন করছি- এই মামলায় যেন আইনের সফল ব্যবহার হয়ে থাকে এবং তার (খালেদা জিয়া) প্রতি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাতিল ঘোষণা করা হয়।’

পরে আসামিপক্ষের আবেদনের শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বিচারকের উদ্দেশে বলেন, ‘ফৌজদারি আইনে অনুপস্থিত থেকে মামলা চালানোর কোনো বিধান নেই। আসামিরা উপস্থিত হয়ে জামিন আবেদন করুক। তখন আপনি তাদের আবেদন মঞ্জুর করবেন কি না সেটা আপনার সিদ্ধান্ত। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা মামলায় বায়াস হওয়া নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছেন তা সম্পূর্ণ আদালত অবমাননার শামিল।’

এরপর উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার বলেন, ‘এই মমলায় অভিযুক্ত মোট ৬ জন। এদের মধ্যে শুরু থেকেই দুইজন পলাতক। এছাড়াও গত ২৫ ফেব্রুয়ারি একজন আসামিও মামলা চলাকালে উপস্থিত ছিলেন না। তাই তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘শুনানিতে বলা হয়েছে- আমি বায়াস হয়েছি। বায়াস হয়ে রুল জারি করেছি। এটা আমার দৃষ্টিতে আদালত অবমাননা। গতকাল সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন- এই বিশেষ আদালতে আমি যা করেছি, তার সবই অবৈধ। তাহলে আজ এই আদালতে সবই অবৈধ শুনানি হয়েছে।’

বিচারক বলেন, ‘আমাকে তো সব বুঝিয়ে বলার দরকার হয় না। আমিও তো কিছু আইন সম্পর্কে ধারণা রাখি। তবুও খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের আবেদনটি নথিভুক্ত থাকলো। তবে তারেক জিয়ার মামলা তার অনুপস্থিতিতে চলতে থাকবে। সব বিবেচনা করে ওইদিন তাদের জামিন বাতিল করেছিলাম। তারা যদি উপস্থিত হয়ে রিকল (পুনরায় শুনানি) করতে চান তাহলে আমরা শুনবো।’

বিচারক আরো বলেন, ‘দুটি পিটিশন আগামীকাল শুনানির জন্য হাইকোর্টে রয়েছে। আমি বিচারকে দৃশ্যমান করতে চাই। আমি বায়াস হতে চাই না। আমিও তো কিছু আইন জেনেই এখানে এসেছি। উপস্থিত এতো মানুষের সামনে আমাকে এভাবে না বললেও পারতেন। আপনাদের এমন আচরণে আমি অপমানিত হয়েছি।’

Share.

Leave A Reply