আজ মঙ্গলবার উপমহাদেশের মহিয়ষী নারী নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর ১১১তম মৃত্যুবার্ষিকী

0

উপমহাদেশের প্রথম মহিলা নওয়াব নারী শিক্ষার অগ্রদূত মহিয়ষী নারী নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর আজ মঙ্গলবার ১১১তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনসহ সরকারী-বেসরকারী সামাজিক সংগঠনসহ নওয়াব পরিবারের সদস্যরা ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। ১৮৩৪ সালে তৎকালীন ত্রিপুরা (কুমিল্লা) জেলার হোমনাবাদ (লাকসাম) পরগনার ডাকাতিয়া নদীর তীর ঘেরা পশ্চিমগাঁওয়ে বিদ্যোৎসাহী, সমাজেসেবী ও সাহিত্যব্রতী জমিদার নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী জন্ম গ্রহণ করেন। জমিদার আহম্মদ আলী চৌধুরী ও আরফুন্নেছা চৌধুরানীর তৃতীয় কন্যা নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী। নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর দুই ভাই ইয়াকুব আলী চৌধুরী ও ইউছুফ আলী চৌধুরী। ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী পিতা-মাতার অতি আদরের সন্তান হওয়ায় হোমনাবাদ (লাকসাম) পরগনার জমিদারীর দায়িত্ব পান তিনি। মির্জা আগোয়ান খাঁর অধঃস্তন ৬ষ্ঠ বংশধর ও ইয়েমেনের অধিবাসী বিখ্যাত ব্যাক্তি অলিয়েকামেল হোমনাবাদ পরগনার আদি মুসলমান জমিদার সাধুবর গাজী শাহেদা (রঃ) বংশধর জমিদার আহম্মদ আলী চৌধুরীর কন্যা ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী।

বাল্যকালে ১৮৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আকালেই তিনি পিতৃহারা হন। তখন তিনি ১০ বছরের বালিকা মাত্র। এরপর ১৮৮৫ সালে তিনি মাতৃহারা হন। মায়ের মৃত্যুর পর ফয়জুন্নেছা জমিদারীর দায়িত্ব তুলে নিয়ে কর্মতৎপরতার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তুলেন একজন সুদক্ষ, প্রজাহিতৈষী, শিক্ষানুরাগী, তেজস্বী ও বিচক্ষণ শাসক হিসাবে। জমিদার ফয়জুন্নেছার সমগ্রজীবন ছিল নিয়মতান্ত্রিক ও সু-শৃঙ্খলার মধ্যে। জমিদারী পরিচালনা ছাড়াও তাঁর দুটি প্রধান সাধনা ছিল আল্লাহর ইবাদত এবং সাহিত্য সাধনা। নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর জমিদারীর ১৪টি মৌজা ছাড়াও দেশে-বিদেশে ১৪টি প্রাথমিক মক্তব, প্রাথমিক বিদ্যালয়, দ্বীনিয়াত শিক্ষা, হাইস্কুল, বালিকা বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, দাতব্য চিকিৎসালয়, হাসপাতাল, দিঘী-পুকুর, মসজিদ, মুসাফিরখানা, পুল-ব্রিজ, পত্র-পত্রিকায় পৃষ্ঠপোষকতা, কবি সাহিত্যিকদের সাথে যোগাযোগ, ফয়জুন পাঠাগার, রূপজালাল গ্রন্থ রচনাসহ বিভিন্ন জনহিতকর কাজ করে গেছেন তিনি। এছাড়াও ১৮৯৪-৯৫ সালে পবিত্র মক্কা শরিফে হজ্বব্রত পালন করতে গিয়ে ওই দেশের বাদশা আব্বাসিয় খলিফা হারুনুর রশিদের স্ত্রীর নামে যোবায়দা নহর পুনঃখনন এবং একটি মুসাফিরখানা স্থাপন করেন।

ভারতের তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ ডগলাস জনকল্যানমুখি কাজে বিশাল পরিমান অর্থ যোগানের জন্য দেশের সকল জমিদারদের কাছে চিঠি পাঠান। বিশাল পরিমান এ অর্থ যোগানের কথা ভেবে ওই জনকল্যানমুখী কাজে দেশের অন্যান্য জমিদাররা টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেও শেষ মূহর্তে হোমনাবাদ পরগনার জমিদার ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী জনকল্যানে ওই টাকা ঋণ হিসাবে না দিয়ে সম্পূর্ন দান টাকা করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন বৃটিশ রানী ভিক্টোরিয়া বিশ্বের একজন মুসলিম নারী জমিদারের এরূপে আচরণে মুদ্ধ হয়ে ভিক্টোরিয়া মহারানী ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীকে ‘‘বেগম’’ উপাধিতে ভূষিত করলে তিনি সম্মানের সাথে ওই উপাধি প্রত্যাখান করেন। ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী ভিক্টোরিয়া মহারানীকে জানান মহিলা জমিদার হিসাবে এমনিতেই তিনি বেগম বলে পরিচিত। পরে ভিক্টোরিয়ার রাজদরবারে পুনঃরায় পরামর্শ করে ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীকে ১৮৮৯ খ্রিঃ ‘‘নওয়াব’’ উপাধিতে ভুষিত করেন।

ইয়েমেনের অধিবাসী বিখ্যাত ব্যাক্তি অলিয়েকামেল হোমনাবাদ পরগনার আদি মুসলমান জমিদার সাধুবর গাজী শাহেদা (রঃ) অপর বংশধর কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার বাউকসারের জমিদার মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী। কিশোরী ফয়জুন্নেছার বিয়ের প্রস্তাব আসে দুঃসর্ম্পকীয় আত্মীয় ওই জমিদার মোহাম্মদ গাজী চৌধুরীর সাথে। অনেক নাটকীয় ও কৌশলী শর্তের বেড়াজালে অবশেষে ফয়জুন্নেছার বিয়ে সম্পন্ন হলো জমিদার মোহাম্মদ গাজী চৌধুরীর সাথে। চলে গেলেন স্বামীর বাড়ি বরুড়া উপজেলার বাউকশার গ্রামে। মোহাম্মদ গাজী চৌধূরী ও ফয়জুন্নেছার জীবন সুখে চলছিল। এরমধ্যে ফয়জুন্নেছার কোলজুড়ে জন্ম নেয় দুই কন্যা সন্তান আরশাদুন্নেছা ও বদরুন্নেছা। কিছুদিন পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অমিল শুরু হলে বড় মেয়ে আরশাদুন্নেছাকে স্বামীর বাড়ীতে রেখে ছোট মেয়ে বদরুন্নেছাকে সঙ্গে নিয়ে লাকসামের পশ্চিমগাঁও চলে আসেন ফয়জুন্নেছা চৌধুরীরানী। এখানে এসে শুরু করেন পিতামাতার উত্তোরসুরী হিসেবে জমিদারী পরিচালনা। তার জমিদারীর শাসনামলে হাসি কান্না দুঃখ বেদনায় ভরপুর তার সার্বিক জীবন কাহিনী নিয়ে রূপক কাব্যগ্রন্থ ‘‘রূপজালাল’’ বইটি ১৮৭৬ সালে প্রকাশ করার পর অবশেষে ১৯০৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এ মহিয়ষী নারী নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী চিরনিদ্রায় শায়িত হন তারই নির্মিত নওয়াব বাড়ি জামে মসজিদের পাশে। তবে দেরীতে হলেও রাষ্ট্রীয় ভাবে তিনি মরনোত্তর একুশে পদক পেলেও নওযাব হিসেবে এখনও পাননি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ইতোমধ্যে লাকসাম জিলা বাস্তবায়ন পরিষদ, লাকসাম জেলা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটিসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন দাবী জানিয়ে আসছেন।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোঃ হাচানুজ্জামান উৎপল এ মহিয়ষী নারী নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর বাড়ী ও বিভিন্ন স্থাপত্য পরির্দশনে এসে তাঁর ১১১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালনের উদ্দ্যেগ নেয়ায় লাকসাম জিলা বাস্তবায়ন পরিষদ, লাকসাম জেলা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটি লাকসাম আমার গর্ব সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন জেলা প্রশাসককে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

Share.

Leave A Reply