আরেকটি নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয়!

0

এতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে আর আগে আর কখনও টেস্ট সিরিজ খেলতে নামতে পেরেছিল কি না বাংলাদেশ, তা খুঁজে বের করা কঠিন। পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে রীতিমত আঁতকে উঠতে হয়। এর আগে যতগুলো টেস্ট খেলেছে, প্রায় প্রতিটিতে প্রতিদ্বন্দ্বীতাই গড়তে পারেনি টাইগাররা। সেই পাকিস্তানের বিপক্ষে কি না এবার টেস্ট সিরিজেও ফেভারিট মুশফিকুর রহিমের দল!

পরিস্থিতি তো আসলে পরিবর্তণ করে দিয়েছে ওয়ানডে সিরিজ এবং একমাত্র টি২০ ম্যাচটিই। পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৬ বছরের জয়ের ক্ষুধা মেটানোই নয় শুধু, ৩ ম্যাচের প্রত্যেকটিতেই দাপটের সঙ্গে জয় নিয়ে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেছে মাশরাফি বাহিনী। সেই আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে টগবগ করে ফুটছে এখন বাংলাদেশ শিবির। তবে কি, ওয়ানডে-টি২০’র মত পাকিস্তানকে দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটেও নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে! আত্মপ্রকাশ করবে ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে!

ক্রিকেটে বাংলাদেশের পুনর্জন্ম যদি ধরা হয়, তাহলে ধরতে হবে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপকেই। বাউন্সি কন্ডিশনে যেখানে উপমহাদেশের দলগুলো স্রেফ উড়ে যাচ্ছিল, সেখানে ব্যাতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। একটা ম্যাচ আচমকা ভালো খেলে ফেলতে পারে। যাকে ক্রিকেটীয় ভাষায় ‘অঘটন’ বলা হয়। কিন্তু অ্যাডিলেড থেকে ওয়েলিংটন, নেলসন থেকে মেলবোর্ন- অসাধারণ ধারাবাহিক এবং দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, তারা সত্যি সত্যি বদলে গেছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাস ১৪ বছরের পুরনো। সময়টা খুব কম নয়। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের সাফল্যের ভাণ্ডার ‘শূণ্য’। তবে, সবচেয়ে ভালো ব্যবধানে হারের কথা বললে- ২০০৩ সালে মুলতান টেস্টে বাংলাদেশের ১ উইকেটে পরাজয়ের কথাই উঠে আসবে বার বার।

মোট আটবার পাকিস্তানের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। এর মধ্যে চারবারই হেরেছে ইনিংস ব্যবধানে। দুবার ৭ উইকেট এবং একবার ৯ উইকেটের ব্যাবধানে হার। সর্বশেষ ২০১১ সালে ঢাকা টেস্টে পরাজয় ৭ উইকেটে।

এবার কি তবে ইতিহাসের পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন মুশফিকুর রহিমরা! টেস্ট আর ওয়ানডে ক্রিকেটের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য! বিশ্বকাপের আগেই আরব আমিরাতে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকে নাকানি-চুবানি খাইয়েছিল মিসবাহ-উল হকের দল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জিতেছিল টেস্ট সিরিজ। ওই দুই সিরিজে ৫টি সেঞ্চুরি করেছিলেন ইউনিস খান। টানা তিন সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েছেন মিসবাহ এবং ইউনিস – দু’জনই।

ওয়ানডেতে ফর্ম যাই হোক, টেস্টে যে অপরিবর্তিত পাকিস্তানকেই দেখা যাবে, তাতে খুব একটা সন্দেহ নেই। তাই বলে কী বাংলাদেশের ইতিহাস বদলানো হবে না! সে সম্ভাবনা মোটেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

কারণ, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের শরীরি ভাষাই পরিবর্তণ হয়ে গেছে। জয়ের মানসিকতা এখন প্রতিটি ক্রিকেটারের চিন্তা-চেতনায়। পাকিস্তানকে ওয়ানডেতে ‘বাংলাওয়াশ’ আর টি২০তে আফ্রিদির দলকে হারানোর পর আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে টাইগারদের। টেস্টেও জয়ের মানসিকতা তৈরী হয়ে গেছে মুশফিকের দলের মধ্যে।

খুলনায় ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের কথায়ও এর আঁচ পাওয়া গেলো। টেস্টে পরাশক্তিদের মুখোমুখি হওয়ার আগে বাংলাদেশের সব অধিনায়কই বলতেন, আমরা ড্রয়ের লক্ষ্যে খেলতো নামবো। এবারই প্রথম দৃঢ়তার সঙ্গে জয়ের লক্ষ্যের কথা বললেন মুশফিক। তিনি বলেন, ‘আমরা জয়ের লক্ষ্যেই খেলতে নামবো। ড্রয়ের লক্ষ্যে নয়। কারণ, ড্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে নামলে সেটা মাঠের খেলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং ফল ভিন্নও হতে পারে।’

DSC_0767-(1)পাকিস্তান যতই শক্তিশালি হোক, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স নিশ্চই নৈতিক এবং মানসিকভাবে তাদের দুর্বল করে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, শেষ ওয়ানডেতে পাকিস্তান ২ উইকেটে ২০৩ করে ফেলার পরও তাদের ২৫০ রানে বেধে ফেলেছিল বাংলাদেশ এবং টি২০তে ৩৮ রানে ৩ উইকেট পড়ার পরও বিপর্যয়ের মুখ থেকে যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ বের করে এনেছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা, সেটাই এখন বড় ভয় পাকিস্তানের। টেস্টেও যদি একই মানসিকতা ধরে রাখতে পারে স্বাগতিকরা, তাহলে সেটা তাদের জন্য বিপদেরই কারণ হতে পারে।

সর্বশেষ মুশফিকের কথা শুনে ফিলে চমকে উঠতে পারে পাকিস্তান টিম ম্যানেজমেন্টের। মুশফিক দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ব্যাটিংয়ে যে শক্তি রয়েছে, তাতে অনায়াসে ৬০০ তোলার সামর্থ্য আমাদের রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নেওয়ার বোলিং শক্তিও রয়েছে আমাদের সামনে।’

ওপেনিংয়ে তামিম রয়েছে ক্যারিয়ারে চূড়ান্ত ফর্মে। সঙ্গে সৌম্য সরকার তো বলা যায় এখনও অপরিশোধিত ডায়মন্ড। ইমরুল কায়েসের টেস্ট রেকর্ড ওয়ানডের চেয়ে ভালো। সর্বশেষ টেস্টে চট্টগ্রামে সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন তিনি। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ বিশ্বকাপে টানা জোড়া সেঞ্চুরির পর মুখিয়ে আছেন ফর্মে ফিরতে। টেস্ট হতে পারে তার আদর্শ ফ্ল্যাটফর্ম। সাকিব আল হাসান আর মুশফিকুর রহিম তো বাংলাদেশের উইজার্ড। ব্যাট হাতে তাদের ওপর যে কেউ চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারে।

মুমিনুল হক তো বাংলাদেশের ব্র্যাডম্যান। সাব্বির-নাসিরের মধ্যে যাকেই খেলানো হোক, নিজেকে প্রমানের সর্বোচ্চ চেষ্টা তাদের মধ্যে থাকবেই। টেল এন্ডারে বাংলাদেশের বোলাররাও মাঝে-মধ্যে সেঞ্চুরি করে বসেন। প্রমাণ, আবুল হাসান রাজু এবং সোহাগ গাজী (যদিও এ দু’জন এবার নেই)। সুতরাং, সাকিবের ভাষায় এবার বলতে হয়, ‘এবার পাকিস্তানের বিপক্ষে আমরাই ফেভারিট।’

মুখের কথা যদি মাঠে বাস্তবায়ন করে দেখাতে পারে মুশফিকের দল, তবে সেটা হতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য নতুন এক মাইলফলক। সৃষ্টি হবে নতুন ইতিহাস। এমনকি এই সিরিজ দিয়েই হয়তো, শ্রেষ্ঠত্বের পথে প্রথম পদক্ষেপটা দিয়ে ফেলবে বাংলাদেশের ক্রিকেট।

Share.

Leave A Reply