আরেফিন শুভর অনেক পরিণত অভিনয়

0

ম্যাপল ফিল্মস এর ব্যানারে টপি খান প্রযোজিত গত ১মে ২০১৫ তে মুক্তি পেল বাংলা চলচ্চিত্র ‘ওয়ার্নিং’। সাফিউদ্দিন সাফি ‘অগ্নি’ সিনেমার সাফল্যের পর আরিফিন শুভ ও মাহিয়া মাহী জুটিকে নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রটি ৯ জানুয়ারি ২০১৫ তে মুক্তির কথা থাকলেও দেশের রাজনৈতিক অবস্থা, বিশ্ব ইজতেমা ও বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কারণে মুক্তি দিতে দেরি হয়েছে।

‘ওয়ার্নিং’ সিনেমার গল্পটি দুজন টিভি রিপোর্টারকে কেন্দ্র করে। জিসান (আরেফিন শুভ) ও তৃণা (মাহিয়া মাহি) দুজনে যথাক্রমে ‘এক্স’ ও ‘ওয়াই’ টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার। জিসান একজন ডাক্তারকে অপহরণ করে এবং মুক্তিপন দাবি করে ১ কোটি টাকা। সেই মুক্তিপণের টাকা ছদ্মবেশে ভিক্ষুকের আনতে গেলে ডিসি ডিবি মুরাদের (রুবেল) নেতৃত্বে একটি টিম তার পিছু ধাওয়া করে। এই সময় দৌড়াতে দৌড়াতে সে চ্যানেল ‘এক্স’ এর হাউজে ঢুকলে পুলিশ ও তার পিছু পিছু ঢোকে। ডিসি ডিবি মুরাদ তাকে দৃঢ়ভাবে চিহ্নিত করলেও সবাই বলে সে ঐ চ্যানেলের রিপোর্টার। এই মুহূর্তে অপহৃত ডাক্তারের গোপন ভিডিও টিভি চ্যানেল ‘ওয়াই’ তে প্রচারিত হয়। তাতে দেখা যায় কালো পোশাক পরিহিত কয়েকজন ওস্তাগার (মিশা সওদাগর) সম্পর্কে জানতে চাইলে ঐ ডাক্তার না বলে পিস্তল ঠেকিয়ে নিজে গুলি করে আত্মহত্যা করে। এমতবস্থায় পুলিশের একজন বিল্ডিং এর ছাদের উপরে ভিক্ষুকের পোশাক ও টাকা বিহীন ব্যাগ পাওয়ার কথা জানায়। এর পরের দৃশ্যে দেখা যায় তেলবাহী ট্যাংকের মধ্যে অভিনব কায়দায় ওস্তাগারের বাস।

চ্যানেল ‘ওয়াই’ তে প্রচারিত ভিডিওর পর তৃণা স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে ওস্তাগারের খোঁজে নেমে পড়লে ওস্তাগারের লোকজন তাকে তুলে নিয়ে যেতে চাইলে জিসান এসে রক্ষা করে।

এরপর আরেকটি অপহরণ। এখানেও ২ কোটি টাকা মুক্তিপণ নেয় জিসান। আগের মত ‘ওয়াই’ চ্যানেলে ভিডিও প্রকাশ। ওস্তাগারের ঠিকানা বলতে না পারার অপারগতা স্বীকার করে পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা। একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল প্রত্যেক অপহরণের আগে ডিসি ডিবি মুরাদের অফিসে ফ্যাক্সের মাধ্যমে ওয়ার্নিং আসে। সেই বার্তা পেয়েই পুলিশ অপহরণকারীকে ধাওয়া করে। পুলিশ দুই বার সরাসরি অপহরণকারীকে ধরতে ব্যর্থ হয়ে হাসপাতালের সি সি ক্যামেরা ফুটেজ থেকে ছবি নিয়ে স্ক্যানিং করে দেখে এই অপহরণকারী হল জিসান।

মুরাদ তার বাহিনী নিয়ে জিসানের বাসায় তাকে গ্রেফতার করতে গেলে সেখানে ভালবাসার কথা বলতে আসা তৃণাকে অস্ত্রের মুখে ঠেকিয়ে জিসান সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এরপর তৃণার কাছে জিসান ওস্তাগার ও তার সংঘবদ্ধ চক্রের ক্রিয়া-কলাপ বলে। কিভাবে ওস্তাগার, জাহাঙ্গীর, পুলিশ মিরাজ এদের সংঘবদ্ধ চক্রের রিয়েল এস্টেট অবৈধ ব্যবসার কারণে বিল্ডিং ধ্বসে জিসানের বাবা আর বোন মারা যায় এবং মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এরপর তৃণা মুক্তিপণের টাকার কথা জানতে চাইলে জিসান সেগুলো দিয়ে ঐ ধ্বসে পঙ্গুদের চিকিৎসা ঘুরে ঘুরে দেখায়। এখানে দেখা যায় জিসানের সাথে তার কিছু বন্ধু সম্মিলিতভাবে ওস্তাগারের বিরুদ্ধে কাজ করে। এরপর জিসান তৃণাকে মুক্ত করে দিলে তৃণা মুরাদের কাছে আসে এবং ওস্তাগার সম্পর্কে সব বলে।

ঠিক এমন সময় আরেকটি ফ্যাক্স- ওয়ার্নিং হিসাবে জাহাঙ্গীর (শানু শিবা) কে অপহরণের কথা বলে। মুরাদ তার টীম নিয়ে জাহাঙ্গীরের অফিসে পাহারা দিলে জিসান মুরাদকে ফোন দিয়ে বলে যে, পরের ফ্যাক্সটা আগে চলে গেছে। আসলে সে পুলিশ অফিসার মিরাজকে অপহরণ করছে। মিরাজের মাধ্যমে সে জানতে পারে যে প্রতি বৃহস্পতিবার ওস্তাগার উত্তরার একটি নাইট ক্লাবে যায়। জিসান ওস্তাগারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার সময় মিরাজ যে কোনভাবে মুক্ত হয়ে তাকে অস্ত্র ঠেকিয়ে ওস্তাগারের কাছে নিয়ে যায়। মিরাজ জিসানকে গুলি করে মেরে ফেলতে চাইলে ওস্তাগার অসম্মতি জ্ঞাপন করে জিসানের শেষ ইচ্ছা জানতে চায়। সে তার শেষ ইচ্ছা হিসাবে ‘এক্স’ টিভি চ্যানেল দেখতে চায়। যাতে ঐ ঘটনার লাইভ টেলিকাস্ট দেখা যায়। এরপর মারপিট। তেলবাহী লরিতে পুড়ে ওস্তাগারের নির্মম মৃত্যু। জিসানকে গ্রেফতারের মাধ্যমে সিনেমার সমাপ্তি।

পুরো সিনেমায় গল্পের দুর্বলতা প্রকট ছিল। চিত্রায়নের ধরণ দেখে একবাক্যে বলা যাবে না, গল্পটি কিসের। যদিও শেষে মোটামুটি ধরা গেছে যে অবৈধ রিয়েল এস্টেট ব্যবসা এবং এর ভুক্তভোগীদের গল্প। কিন্তু পুরো সিনেমাতে অপহরণের দৃশ্য গুলো এমনভাবে চিত্রায়িত যে গল্পটি অপহরণের মনে করলেও খুব বেশি একটা ভুল হবে না। সিনেমার প্রথমেই শিশু অপহরণ প্রচেষ্টার একটি দৃশ্য দিয়ে শুরু। এই দৃশ্যটা একেবারে অপ্রয়োজনীয় ছিল। যার সাথে পুরো সিনেমার কোন যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় নি।

এরপর বিভিন্ন দৃশ্যের সেট গল্পের সাথে মানানসই মনে হয়নি। বিশেষ করে ওস্তাগারের তেলের লরির ভিতরে বসবাস। এটা সরাসরি কাল্পনিক বলা যেতে পারে। শেষ দৃশ্যে নাইট ক্লাবে আইটেম গান চলছে, সিনেমার প্রধান চরিত্রগুলো ব্যতীত অন্য কোন লোকজন নাইট ক্লাবে নেই। যেটা দেখে এটাকে কৃত্রিম মনে হয়েছে। এটাকে প্রাণবন্ত করার জন্য লোকজন রাখা প্রয়োজন ছিল। ওয়ার্নিংগুলো যে ফ্যাক্সের মাধ্যমে আসে তার সত্যতা প্রতিষ্ঠা পায় নি। সিনেমার দৃশ্যায়ন ও সংলাপে কন্টিনিউটি ব্রেক করাটা ছিল লক্ষণীয়। যেমন- ওস্তাগারের লোকজনের হাত থেকে তৃণাকে রক্ষার সময় জিসান যখন মারপিট করে তখন তাকে ক্লিন সেভ দেখা যায়। এরপরের দৃশ্যেই দেখা যায় জিসানের মুখে খোঁচা দাড়ি।

আবার নারী পাচার নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে তৃণা যখন ভিতরে ঢুকে যায় তার বোরকার ভিতরে রাখা ক্যামেরায় ধারণকৃত দৃশ্য তৃণার দাঁড়ানোর অ্যাঙ্গেল থেকে নেওয়া হয় নি। সেই দৃশ্যটা যখন ‘ওয়াই’ চ্যানেলে দেখাচ্ছিল তখন দেখা যায় লোকটিকে সামনে থেকে ক্যামেরায় ধারণ করা। অথচ তৃণা একপাশে দাঁড়ানো ছিল যাতে লোকটির পুরো মুখের অবয়ব না দেখে একপাশ দেখতে পারার কথা। সিনেমার শেষ দৃশ্যের সংলাপে জিসান দেখতে চায় চ্যানেল ‘এক্স’। কিন্তু দর্শকদের দেখানো হয় চ্যানেল ‘ওয়াই’। এটা একটা লক্ষণীয় ভুল।
warning-2

সর্বোপরি গল্প প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। দুইজন রিপোর্টারের কাহিনী নিয়ে গল্পটিতে মনে হয়েছে গবেষণার দুর্বলতা রয়েছে। যেমন- রিপোর্টারদের কাজ কি, তারা কি ভাবে কাজ করে, রিপোর্টার কি কি করতে পারে , কি করতে পারে না, হাউজগুলোতে তাদের অবস্থান কেমন থাকে ইত্যাদি। যেমন- স্টাফ রিপোর্টার তৃণা ভিডিওটি প্রচার করল। সেটা কি ধরণের অনুষ্ঠান ছিল? নিউজ না অনুসন্ধানভিত্তিক ক্রাইম অনুষ্ঠান তা স্পষ্ট ছিল না। আমার কাছে মনে হয়েছে অনুসন্ধান ভিত্তিক ক্রাইম অনুষ্ঠান। আর সেটা উপস্থাপনের জন্য আলাদা উপস্থাপক থাকেন। স্টাফ রিপোর্টার সেটা উপস্থাপনা করেন কি? আবার দুই টিভি হাউজে দুইজন স্টাফ রিপোর্টারকে মধ্যমনি হিসাবে দেখানো হয়েছে। যেটা গল্পের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মনে হয়েছে।

ডিসি ডিবি মুরাদের মুখের সংলাপে প্রতিষ্ঠিত তিনি নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী। আবার সেই পুলিশ অফিসারকে নিজের বোন নিয়ে বিভিন্ন সময় চিন্তিত হতে দেখা গেছে। তাহলে সবাইকে নিরাপত্তা দেওয়ার আত্মবিশ্বাস তার কীভাবে থাকে। যা আমার কাছে গল্পের দুর্বলতা মনে হয়েছে। পুলিশ অফিসার মুরাদ অপহরণকারী জিসানকে খুজছে। কিন্তু তিনি জানেন না, জিসান কি কারণে অপহরণ করছে বা যাদের অপহরণ করছে ও কেন করছে? অপহরণের ভিডিওতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় ওস্তাগার নামের কেউ একজন এই অপহরণ গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। এই ওস্তাগার এতো বড় একজন অবৈধ রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী তা পুলিশকে খুঁজতে দেখা যায় নি। আবার পুলিশ তার সম্মন্ধে জানেও না। মুরাদ ওস্তাগার সম্পর্কে প্রথম জিসানের কাছ থেকে ফেরত আসা তৃণার কাছ থেকে শুনতে পায়।

এই সিনেমাতে ইতিবাচক অনেক কিছুর ইঙ্গিতও ছিল। বাংলা চলচ্চিত্রে গল্পের ভিন্নতা যে আসছে তা বোঝা যায়। সাফিউদ্দিন সাফি সেই রকম একটি ভিন্ন ধরণের গল্প নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। গল্পটি মোটামুটি টিপিক্যাল বাংলা সিনেমার গল্প থেকে আলাদা ছিল। পারিবারিক প্রেম-ভালবাসা বা সৌন্দর্যের কারণে প্রেমের বাইরে পেশাগত আদর্শের কারণে ভাললাগা ভালবাসা গল্পের নতুন মাত্রা। যা নতুন গল্পে নতুনভাবে কাজ করার জন্য অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে।

সিনেমাতে সবকটি গান সুন্দর ছিল। গানগুলির কস্টিউমেও ভিন্নতা ছিল চোখে পড়ার মত। ওস্তাগারের চলন্ত লরির দৃশ্যায়নের সময় ক্যামেরায় জারকিং ছিল। যেটা বলা যায় পরিচালকের সুনিপুণতা। সিনেমার শেষ দৃশ্যে নাইট ক্লাবে চারদিকে বিলাসী জীবনের আলকচ্ছটার মাঝে দাঁড়িয়ে জিসানের প্রতিবাদী সংলাপের চিত্রায়ণ এক কথায় অনিন্দ্য সুন্দর। সর্বোপরি আমার কাছে মনে হয়েছে আরেফিন শুভ অনেক পরিণত অভিনয় করেছেন।

– লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র।

Share.

Leave A Reply