ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা তারেককে, পুলিশ বলছে বন্দুকযুদ্ধে…হায় দেশ !!!!!

0

কদমতলীর দনিয়া কাব হয়ে শনির আখড়া যেতে হাতের বাঁ দিকের একটি টিনসেড বাড়ি। ছোট্ট নালার ওপর দিয়ে কাঠের পাটাতন। তার ওপর দিয়ে ঢুকতে হয় বাড়িতে। বাড়ির সামনের টঙ দোকান থেকে পান কিনছিলেন ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। তারেকের বাড়ি কোনটি? জিজ্ঞেস করতেই জানতে চাইলেন ‘পুলিশের নির্যাতনে যে তারেক মারা গেছে?’ উত্তর দেয়ার আগেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। কিছু জানতে চাওয়ার আগেই রাস্তার পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে ইশারা করে বললেন, ওই গাছটি আমাদের চোখের সামনে যেভাবে বড় হয়েছে, তারেকও সেভাবে আমাদের চোখের সামনে বড় হয়েছে। ছোট্ট বেলায় এসেছে এই এলাকায়। কোনো দিন বেয়াদবি করা তো দূরে থাক, কারো চোখে চোখ রেখে বা মুখের দিকে তাকিয়েও কথা বলেনি। টিনের গেটে টোকা দিতে বেরিয়ে এলেন এক বয়স্ক নারী। বললাম তারেকদের বাসায় যাবো। নিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় দু-চারটি শব্দে সে রাতের যে কাহিনী বর্ণনা করলেন, তা ভয়ঙ্কর। কিভাবে পুলিশ ঢুকল, কিভাবে তারেক ঘুম থেকে জাগিয়ে তাদের সামনেই নির্যাতন করল, টেনেহিঁচড়ে কিভাবে ঘরের বাইরে নিয়ে গেলÑ এক শ্বাসে এগুলো বলে যাচ্ছিলেন ওই মহিলা।
গত ১৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। রাজধানীর মুগদার গ্রিন মডেল টাউন বালুর মাঠ এলাকায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মেজবাহ উদ্দিন তারেক (২৪)। ওই দিন মুগদা থানার ওসি মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেছিলেন, রোববার সকাল ৯টার দিকে মুগদা গ্রিন মডেল টাউন বালুর মাঠে একদল ছিনতাইকারী ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওই সময়ে ডিবি পুলিশের একটি দল তাদের গতিরোধের চেষ্টা করলে তারা ডিবি পুলিশকে ল্য করে গুলি ছোড়ে। ডিবি পুলিশও গুলি চালায়। এতে তারেক নিহত হয়। আর ডিবি পুলিশ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছিল, ‘তারেক একজন অস্ত্র ব্যবসায়ী। শনিবার রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সে পুলিশকে জানায়, রোববার ভোরে তার সহযোগী ব্রিস্টল, কালু, ভাগিনা রুবেল ও রকি মুগদা থানাধীন মান্ডা এলাকার গ্রিন মডেল টাউনসংলগ্ন বালুর মাঠে একত্র হবে। তাদের ৩-৪টি অস্ত্র নিয়ে একটি অপারেশনে যাওয়ার কথা রয়েছে। পুলিশ তার কথামতো সকাল ৭টার দিকে অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেফতারের জন্য লক্ষ্যে বালুর মাঠে পৌঁছে। এ সময় পুলিশ তারেককে ছেড়ে দিয়ে কৌশলে অবস্থান নেয়। অপরাধীদের কাছাকাছি পৌঁছে কৌশল হিসেবে পুলিশ সহযোগীদের শনাক্ত করতে তারেককে ছেড়ে দেয়। কিন্তু তারেক সহযোগীদের কাছে গিয়ে পুলিশকে তাদের দেখিয়ে না দিয়ে উল্টো এক সহযোগীর কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পুলিশ তখন পাল্টা গুলি চালায়।’
কিন্তু পুলিশের এসব বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে তারেকের পরিবার। গতকাল ওই বাড়িতে ঢুকতেই ভেতর থেকে শোনা যায় তারেকের মায়ের দীর্ঘ নিঃশাস। ‘হে আল্লাহ যারা আমার বুক খালি করেছে তুমি তাদের বুক খালি করো।’ তিনি বলেন, পুলিশ আমার কলিজা থেকে আমার ছেলেকে টেনে নিয়ে গেছে। ২৪ বছর কষ্ট করেছি। বুকে আগলে রেখে মানুষ করেছি। এখন চাকরি করে উপার্জন করার কথা। আর তখনই বিনা কারণে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে খুন করল। তিনি বলেন, আমার এ কান্না আর কোনো দিন থামবে না। এভাবে আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, কোনো মাকে যেন এভাবে কষ্ট ভোগ করতে না হয়। তিনি বলেন, আল্লাহ ওদের শাস্তি দেবেন। রাত ২টার দিকে ডিবি পুলিশ বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। তারেককে ঘুম থেকে জাগিয়ে তাদের সামনেই বেদম মারধর করে। বাসায় তারা কি যেন তল্লাশি করে। ৫টার দিকে তারা তারেককে বাসা থেকে নিয়ে বের হয়ে যায়। শত শত লোকের চোখের সামনে দিয়ে পুলিশ তারেককে বাসা থেকে নিয়ে গেছে। সকালে তারা শুনতে পারেন তারেক নাকি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। জয়নাব বলেন, তার ছেলের নামে দেশের কোনো থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত নেই। কোনো অপরাধের সাথে জড়িত থাকলে তিনি নিজেই ছেলেকে বাড়িতে ঢুকতে দিতেন না। তিনি জানেন, তার ছেলে কোনো অপরাধ কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। লেখাপড়া শেষ করে একটি কোম্পানিতে চাকরি করত তার ছেলে। বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পাসপোর্টও বানিয়েছিল।
তারেকের ভাই ‘এ’ লেভেলের ছাত্র শিহাব উদ্দিন তানজিল বলেন, তার ভাই ওই রাতে তার সাথেই ঘুমিয়ে ছিলেন। ভাইকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে পুলিশ বলছে বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, তার ভাইকে বাসা থেকে বের করার আধা ঘণ্টার মধ্যেই গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। তিনি বলেন, তারা জানতে পেরেছেন ভোর সাড়ে ৫টার দিকেই তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল ঘুরে জানা গেছে, যে স্থানে ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে সে স্থানের আশপাশের কেউই বন্দুকযুদ্ধ বা গোলাগুলির কথা বলতে পারছেন না। তারেকের প্রতিবেশী বিউটি বেগম বলেছেন, তারা ভোরে তারেককে নিয়ে যেতে দেখেছেন। এরপর কিভাবে সে বন্দুকযুদ্ধে জড়ালো তা তাদের বোধগম্য নয়।
এ দিকে বন্দুকযুদ্ধে দুই পুলিশ কর্মকর্তার আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও তার কোনোই প্রমাণ মিলছে না।
তারেকের বাবা আবু জাফর সিকদার একজন ওষুধ ব্যবসায়ী। বাড়ির সামনেই ওষুধের দোকান। তিনি বলেন, এ ঘটনায় তিনি মামলা করবেন। তার ছেলে কোনো অপরাধের সাথে জড়িত ছিল না। শুধু তার বাড়িটি দখলের জন্যই একটি গ্রুপ ডিবি পুলিশকে দিয়ে এ হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেলের ডিসি মাসুদুর রহমান বলেছেন, এ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকলে অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে।

Share.

Leave A Reply