জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর

0

জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

শনিবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এই জামায়াত নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রি. জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন ফাঁসি কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে এশার নামাজের আযান শুনে একাই গোসল করে নেন কামারুজ্জামান। এশার নামাজ আদায়ের পর দুই রাকাত নফল নামাজ পড়েন তিনি। কারা মসজিদের পেশ ইমাম তওবা পড়াতে গেলে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেই তওবা পড়েন এই জামায়াত নেতা।

ফাঁসি স্থগিত করার জন্য জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আবেদনের মধ্যে এই ফাঁসি কার্যকর করা হলো। এর মধ্যে জাতিসংঘ এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দ্বিতীয় কোনো আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হলো।

এর আগে একই ধরনের অভিযোগে আপিল বিভাগে যাবজ্জীবন থেকে সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর।

গত সোমবার কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ। এরপর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা সুযোগ থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম এই নেতা তা নাকচ করে দিয়েছেন এই বলেন যে, প্রাণের মালিক আল্লাহ, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইব কেন?

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কামারুজ্জামানকে ২০১৩ সালের ৯ মে ফাঁসির আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এরপর গত বছরের ৩ নভেম্বর বিভক্ত রায়ে কামারুজ্জামানকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির আদেশ বহাল রেখে রায় দিয়েছিল আপিল বিভাগ।

সর্বশেষ চলতি বছরের ৫ মার্চ আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল মামলার চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা। গত ৬ এপ্রিল রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয় আপিল বিভাগ।

মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। সে হিসেবে ১৯৭১ সালের মার্চে তার বয়স ছিল ১৯ বছরেরও কম। তিনি শেরপুর সদর উপজেলার মুদীপাড়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। তার পিতার নাম মরহুম আলহাজ ইনসান আলী সরকার, মাতার নাম সালেহা খাতুন। গ্রেপ্তারের আগে পর্যন্ত তিনি রাজধানীর মিরপুর-১১ এর পল্লবীর সাংবাদিক আবাসিক এলাকার এফ ব্লকের ৪নং রোডের ১০৫নং বাড়িতে থাকতেন।

কামারুজ্জামান জন্মগ্রহণ করেন এখনকার শেরপুর জেলায় যা তখন ময়মনসিংহ জেলার জামালপুরের অন্তর্গত একটি থানা ছিল।

কামারুজ্জামান ১৯৬৭ সালে জিকেএম ইনস্টিটিউশন থেকে ৪টি বিষয়ে লেটারসহ এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং আবাসিক বৃত্তি লাভ করেন।

১৯৬৭-৬৯ সেশনে জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন। কিন্তু দেশে ’৬৯ এর গণআন্দোলন শুরু হওয়ায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। ১৯৭১ (১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত) সালে ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

১৯৬৭ সালে শেরপুর জিকেএম ইনস্টিটিউশনের দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় জামায়াতের তখনকার ছাত্র সংগঠন‍ ইসলামী ছাত্রসংঘের সমর্থক হিসেবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। আশেক মাহমুদ ডিগ্রি কলেজে পড়ার সময় কলেজের হল শাখার ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সহকারী সাহিত্য সম্পাদক পদে নির্বাচন করেন।

মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৭০ সালের শেষের দিকে কেন্দ্রের নির্দেশে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ যখন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন, তখন তিনি মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক অফিসের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পণ করেন।

১৯৭৩ (১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত) সালে ঢাকা আইডিয়াল কলেজ থেকে ডিস্ট্রিংশনসহ বিএ পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবৃত্তি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে সাংবাদিকতায় এমএ পাস করেন।

ছাত্রশিবিরের প্রথম কমিটির সভাপতি ছিলেন মীর কাসেম আলী। আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কামারুজ্জামান। পরে কামারুজ্জামান ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

এক পর্যায়ে তিনি জামায়াতের মুখপাত্র সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদক ও দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এ সূত্রে তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদ পান। পরে অবশ্য তার সদস্যপদ বাতিল করা হয়।

পর্যায়ক্রমে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে উন্নীত কামারুজ্জামান জাতীয় সংসদের শেরপুর-১ (সদর উপজেলা) আসনের নির্বাচনে বেশ কয়েকবার দলীয় এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের পক্ষে প্রার্থী হয়েছিলেন।

Share.

Leave A Reply