ধৈর্য: গুরুত্ব-ক্ষেত্র-তাৎপর্য : প্রেক্ষিত ইসলামী শরিয়ত

0

সৈয়দ এ.কে.এম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকী: আরবি “ছবর” শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ধৈর্য। যার অর্থ সহ্য বা অপেক্ষা করার ক্ষমতা, সহনশীলতা, বিরত থাকা, ধীরতা ইত্যাদি। ইংরেজি প্রতিশব্দ “চধঃরবহপব” যার অর্থ সহিষ্ণুতা, অধ্যবসায়, কষ্ট সহিষ্ণুতা, দৃঢ়সংকল্প, সহশক্তি, স্থিতি ইত্যাদি। ইসলামী বিশ্বকোষে ইমাম আল-কুশায়রীর উদ্ধৃতি দিয়ে ধৈর্য এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা হল: ধৈর্য হল প্রথমত: অদৃষ্টের আঘাত নিরবে সহ্য করা, দ্বিতীয়ত: প্রসন্ন বদনে দুঃখ-যন্ত্রণা সহ্য করা, তৃতীয়ত: দারিদ্রের মধ্যে মানসিক স্থৈর্য-বজায় রাখা, চতুর্থত: অবৈধ কার্যাবলী হতে বিরত থাকা। পঞ্চমত: নিরবে নির্দ্বিধায় বিপদ বরণ করে নেওয়া ষষ্ঠত: অদৃশ্যের কষাঘাতে জর্জরিত অবস্থায় ও মধুর ব্যবহারে অবিচল থাকা।
ধৈর্য এর প্রকারভেদ :
ধৈর্য ৫ প্রকার যথা ঃ (১) ওয়াজিব ধৈর্য (৩) মুস্তাহাব ধৈর্য (৪) মুবাহ ধৈর্য (৪) মাকরুহ ধৈর্য (ঙ) হারাম ধৈর্য। উল্লেখিত ধৈর্য সমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে উল্লেখ করা হল :
(ক) ওয়াজিব ধৈর্য : প্রথমত: জীবনের জন্য কঠিন ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও আল্লাহর হুকুম পালনে অবিচল থাকার ধৈর্য প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ওয়াজিব। দ্বিতীয়ত: মনের শত চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকার ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা। তৃতীয়ত : দ্বীনের পথে সংগ্রাম করতে গিয়ে আপতিত সকল প্রকার মুছিবতে ধৈর্য ধরা। চতুর্থত: পার্থিব জীবনে যত রকম মুছিবত আসবে তা মোকাবেলার ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা।
(খ) মুস্তাহাব ধৈর্য : বৈধ কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা। অর্থাৎ শরিয়তে যে সকল কাজ ফরজ নয় অথচ বৈধ এবং অত্যন্ত সওয়াবের ঐ সকল কাজ সম্পাদনে ধৈর্য ধরা মুস্তাহাব। যেমন গভীর রজনীতে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া। সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর যিকির করা। মানুষের বিপদে নিজেকে স¤পৃক্ত করে প্রতিনিয়ত মানব কল্যাণে কাজ করা ইত্যাদি।
(গ) মুবাহ ধৈর্য : কোন দায়িত্বশীল কাউকে কোন বৈধ কাজ সম্পাদনের দায়িত্ব দিলে ঐ কাজ সম্পাদন না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বশীলের ধৈর্য ধারণ করা মুবাহ। এছাড়া কেউ যদি কোন ব্যক্তিকে সংশোধনের জন্য কোন পাপ কাজ পরিহারের এবং ভাল কাজ সম্পাদনের দায়িত্ব প্রদান করে সে ক্ষেত্রে ঐ কাজ সম্পাদনে যে পরিমাণ সময়ের প্রয়োজন ঐ সময় পর্যন্ত দায়িত্ব প্রদানকারী ব্যক্তির ধৈর্য ধারণ করা মুবাহ।
(ঘ) মাকরুহ ধৈর্য : যে সকল বৈধ কাজ সময় মত সম্পাদন না করলে শারীরিক বা আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। ঐ সকল ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরা মাকরুহ। যেমন সময় মত খাদ্য-পানীয় গ্রহণ না করলে শরীরের ক্ষতি হয়। এ ক্ষেত্রে কোন যুক্তিযুক্ত কারণ ব্যতীত ধৈর্য ধরা মাকরুহ। রাসূল (সা:) বলেছেন “তোমরা সব কাজ ধৈর্যের সাথে (আস্তে-ধীরে) করবে- তবে ৫টি কাজ তাড়াতাড়ি করবে- প্রথমত : মেয়ে সাবালিকা হলে তাড়াতাড়ি বিবাহ দিবে, দ্বিতীয়ত কেউ মারা গেলে দ্রুত দাফন-কাফন শেষ করবে, তৃতীয়ত : মেহমান আসলে কারো অপেক্ষায় বসিয়ে না রেখে তাড়াতাড়ি খাবার দিবে, চতুর্থত : ঋণ থাকলে তাড়াতাড়ি পরিশোধ করবে, পঞ্চমত: গুনাহ করলে দ্রুত তওবা করবে।”
(ঙ) হারাম ধৈর্য : সকল প্রকার নিষিদ্ধ কাজ সম্পাদনে ধৈর্য ধারণ নিষিদ্ধ। সহজ কথায় হারাম কাজ সম্পাদনে ধৈর্য ধারণ করা হারাম। এছাড়া এমন কিছু বিষয় রয়েছে যেখানে সবর করলে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটতে পারে। যেমন- কোন স্থানে আর অপেক্ষার প্রয়োজন নেই- বরং অপেক্ষা করলে হিংস্র প্রাণী বা চোর ডাকাত দ্বারা জান-মালের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে ঐ স্থানে ধৈর্য ধারণ করে অপেক্ষা করা সম্পূর্ণ হারাম।
ধৈর্যের গুরুত্ব :
গুরুত্ব শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ ওসঢ়ড়ৎঃধহপব, বিরমযঃ, ংবৎরড়ঁংহবংং, মৎধারঃু, যবধারহবংং ইত্যাদি। যার অর্থ প্রয়োজনীয়তা, ভার-গম্ভীর্য, ওজন ইত্যাদি। মূলত: গুরুত্ব বলতে কোন কিছুর প্রয়োজনীয়তাকে বুঝায়। তাহলে ধৈর্যের গুরুত্ব হল মানব জীবনের জন্য ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তা। ইসলামী শরীয়তে “ছবর” বা ধৈর্য হল ঈমানের অর্ধেক। মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধনের মাধ্যমে মূল্যবোধ সৃষ্টি করা, সৎকর্মশীল হওয়া, মানুষকে হকের দিকে আহ্বান ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা, সকল ধরনের মুছিবতকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া, জমিনের দ্বীন কায়েমের জন্য কাজ করা এবং দুনিয়াবী লোভ-লালসা ও কামনা-বাসনাকে পরিত্যাগ করে আখিরাতের পথের উপর অবিচল থাকার জন্য ধৈর্যের কোন বিকল্প নেই। মূলত: ধৈর্য ধারণ করার গুণাবলী হচ্ছে মহান আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশেষ নেয়ামত যা প্রকৃতিগত ভাবে অর্জিত হয় না। ব্যক্তিকে প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। ধৈর্যকে ঈমানের অর্ধেক বলার কারণ হলো দুনিয়া এবং আখেরাতের সফলতা সম্পূর্ণ ধৈর্যের উপর নির্ভরশীল। পৃথিবীতে এমন একজন ব্যক্তির জীবনের ক্ষেত্রেও এমন কোন উদাহরণ নেই যে, যিনি পার্থিব জীবনে সফল হয়েছেন- অথচ তাকে ধৈর্য ধারণ করতে হয়নি। অনুরূপ আজকে আমরা আখেরাতের ক্ষেত্রে যাদের সফল মনে করি, তাদের এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি ধৈর্যের পরীক্ষার মুখোমুখি হননি। অর্থাৎ দুনিয়া এবং আখেরাত উভয় স্থানের সফলতার জন্য ধৈর্য হচ্ছে এক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। যা বাদ দিয়ে কোন ক্ষেত্রেই সফলতা কল্পনাও করা যায় না। ধৈর্যের গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ অসংখ্য আয়াত নাযিল করেন। নিন্মে ধৈর্য সম্পর্কিত কয়েকটি কোরআনের আয়াত ও হাদিস উল্লেখ করা হলো ঃ
# হে নবী আপনি ছবর করবেন। আপনার ছবর আল্লাহর জন্য ব্যতীত নয়। তাদের জন্য দুঃখ করবেন না এবং তাদের চক্রান্তের কারণে মন ছোট করবেন না। (সূরা-নাহল- ১২৭)
# হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্যধারণ করো এবং ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো, সর্বদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো। আর আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। (সূরা: ইমরান- ২০০)
# তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। অবশ্যই তা যথেষ্ঠ কঠিন। কিন্তু সে সমস্ত বিনয় লোকের পক্ষে তা সম্ভব- যারা মনে করে যে, একদিন তাদের রবের নিকট ফিরে যেতে হবে এবং তার সম্মুখীন হতে হবে। (সূরা-বাকারা- ৪৫-৪৬)
# আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। (সূরা-আনফাল- ৪৬ আংশিক)
# আপনি আপনার পালনকর্তার আদেশের অপেক্ষায় ছবর করুন এবং মাছ ওয়ালা ইউনূসের মতো হবেন না। যখন সে দুঃখাকুল মনে প্রার্থনা করেছিল। (সূরা-কলম- ৪৮)
# অতএব আপনি ছবর করুন, যেমন দৃঢ়চিত্ত রাসূলগণ ছবর করেছেন এবং ওদের বিষয়ে তড়িগড়ি করবেন না। (সূরা-আহক্বাফ- ৩৫)
# কাফেরেরা যা বলে- তজ্জন্যে আপনি ছবর করুন এবং সুন্দর ভাবে তাদের পরিহার করে চলুন। (সূরা-মুযাম্মিল-১০)
# আপনার পূর্বে অনেক রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে। তাদের উপর মিথ্যারোপ ও নির্যাতন করা সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করেছেন। (সূরা-আনআম-৩৪ আংশিক)
# আর যারা অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণকারী, তারাই হলো সত্যাশ্রয়ী ও তারাই পরহেযগার। (সূরা-বাকারা-১৭৭)
# তারা দুইবার পুরস্কৃত হবে তাদের ধৈর্যের কারণে। তারা মন্দের জবাব ভাল দ্বারা দেয় এবং আমরা তাদেরকে যা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। (সূরা-ক্বাছাছ-৫৪)
ধৈর্যের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূল (সা:) বলেছেন ঃ
“ঈমানের ২টি অংশ। অর্ধেক ধৈর্যধারণে এবং অর্ধেক কতৃজ্ঞতা জ্ঞাপনে। অর্থাৎ শুকরিয়া আদায় ঈমানের অর্ধেক এবং ধৈর্যধারণ ঈমানের অর্ধেক। আর ইয়াক্বীন বা দৃঢ় বিশ্বাস হলো ঈমানের পূর্ণাংশ।
# যে ব্যক্তি ছবর করতে চায় আল্লাহ তাকে ছবর করার তাওফীক দান করেন। আর ছবরের চাইতে উত্তম ও ব্যাপকতর কল্যাণ আর কোন কিছুতেই নেই।
# জনে রাখ, ছবরের সাথে রয়েছে বিজয় এবং কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি।
# মুমিনের ব্যাপারটি চমৎকার। তার সকল বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর। আনন্দের কিছু হলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। যা তার জন্য মঙ্গলজনক হয়। বিপদে পতিত হলে ধৈর্যধারণ করে। তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।
অতএব দুনিয়ার জীবনে একজন মুমিনের জন্য ধৈর্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে আখেরাতের জীবনে ধৈর্যের কোন গুরুত্ব নেই। অর্থাৎ কোন জাহান্নামী কবরে, হাশরে, পুলসেরাতে বা জাহান্নামে আযাব ভোগকালীন সময়ে ধৈর্য ধরা আর না ধরা সমান কথা।
ইসলামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সাথে “ছবর” শব্দের সম্পৃক্ততা:
পবিত্র কোরআনে অনেক সূরায় ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সাথে মহান আল্লাহ “ছবর” বা ধৈর্যকে সম্পৃক্ত করেছেন। নিন্মে তার কিছু উল্লেখ করা হল:-
(১) তাক্বওয়া ও ছবর: এ প্রসঙ্গে সূরা আল-ইমরানে মহান আল্লাহ উল্লেখ করেন- “আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং তাক্বওয়া অবলম্বন কর, তবে তাদের প্রতারণায় তোমাদের কোনই ক্ষতি হবে না। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে সে সমস্তই আল্লাহর আয়ত্বে রয়েছে” (সূরা-ইমরান-১২০ আংশিক)
(২) তাওয়াক্কুল ও ছবর : এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সূরা-আনকাবুত ও সূরা নাহলে উল্লেখ করেন- “যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে আমি অবশ্যই তাদেরকে জান্নাতের সু-উচ্চ প্রাসাদে স্থান দেব। যার তলদেশে প্রস্রবণ সমূহ প্রবাহিত। যেখানে তারা চিরকাল থাকবে। কত উত্তম পুরস্কার তাদের- যারা ছবর করে এবং তাদের পালনকর্তার উপর ভরসা করে। (সূরা-আনকাবুত- ৫৮-৫৯)। যারা ছবর করেছে এবং যারা নিজেদের রবের উপর ভরসা করে কাজ করছে তারা যদি জানতো (কেমন চমৎকার পরিমাণ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে)। (সূরা-নাহল- ৪২)
(৩) ইয়াক্কীন ও ছবর ঃ এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সূরা-সিজদায় উল্লেখ করেন “তারা ছবর করত বিধায় আমি তাদের মধ্য থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম। যারা আমার আদেশে পথ প্রদর্শন করত। আর আমার আয়াত সমূহে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল। (সূরা-সিজদাহ-২৪)
(৪) সালাত ও ছবর ঃ এ প্রসঙ্গে সূরা-বাকারায় মহান আল্লাহ উল্লেখ করেন- “(তোমরা) ধৈর্যের সাথে সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর নামাজের মাধ্যমে ।” (সূরা-বাকারা-৪৫ আংশিক)। “হে ঈমানদারগণ। তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।” (সূরা-বাকারা- ১৪৫)
(৫) জেহাদ ও ছবর ঃ এ প্রসঙ্গে সূরা-মুহাম্মদে মহান আল্লাহ উল্লেখ করেন “আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করবো যে পর্যন্ত না যাচাই করি- তোমাদের মধ্যে জেহাদকারীকে এবং ছবরকারীকে” । (সূরা-মুহাম্মদ- ৩১ আংশিক)
(৬) সৎকর্ম ও ছবর ঃ এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সূরা হুদে উল্লেখ করেন “তবে যারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং সৎ কর্ম করেছে এবং তাদের জন্য ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান রয়েছে। (সূরা-হুদ-১১)
(৭) শোকর ও ছবর ঃ এ প্রসঙ্গে সূরা-ইব্রাহীমে মহান আল্লাহ উল্লেখ করেন “আমি মূসাকে নির্দেশনাবলী সহ প্রেরণ করেছিলাম যে স্বজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে আনয়ন এবং তাদেরকে আল্লাহর দ্বীন সমূহ স্বরণ করান। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ লোকদের জন্য নির্দেশনাবলী রয়েছে।” (সূরা-ইব্রাহীম- ৫)
(৮) তাসবীহ ও ছবর ঃ এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সূরা-তুর এবং ত্বোয়া-হা এ উল্লেখ করেন “আপনি আপনার রবের হুকুম আসা পর্যন্ত ছবর করুন। আপনিতো আমার চক্ষুর সামনেই রহিয়াছেন। আপনি শয্যা ত্যাগ কালে আপনার রবের তাসবীহ ও হামদ পাঠ করুন।” (সূরা- তুর- ৪৮)
“অতএব আপনি তাদের কথায় ছবর করুন। সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে নিজের রবের প্রশংসা সহ তাসবীহ করুন।” (সূরা-ত্বোয়া-হা- ১৩০ আংশিক)
(৯) এস্তেগফার ও ছবর : এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সূরা-মুমীনে উল্লেখ করেন “অতএব আপনি ছবর করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য আপনি আপনার গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং সকাল-সন্ধ্যা আপনার পালনকর্তার প্রশংসা সহ তাসবিহ করুন।” (সূরা-মুমিন- ৫৫)
(১০) হক্ব ও ছবর : এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সূরা আছরে উল্লেখ করেন “সময়ের কসম। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে হক ও ছবরের উপদেশ দেয়।” (সূরা-আসর-১-৩)
(১১) রহমত ও ছবর : এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সূরা বালাদে উল্লেখ করেন “অত:পর তাদের অর্ন্তভূক্ত হও যারা ঈমান আনে এবং যারা পরস্পরকে ধৈর্য ধারণ ও দয়া প্রদর্শনের উপদেশ দেয়।” (সূরা- বালাদ- ১৮)
ধৈর্য এর ক্ষেত্র :
মানব জীবনের প্রতিটি মূহুর্তে প্রতিটি কর্ম সম্পাদনে ধৈর্যের ক্ষেত্র রয়েছে। অর্থাৎ জীবনের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে ধৈর্যের প্রয়োজন নেই। নিন্মে ধৈর্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র উল্লেখ করা হলো :
(১) আল্লাহর ইবাদত পালনে ধৈর্য : মহান আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষ ও জীনকে কেবল তার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। একজন মুসলমানের জন্য নামায, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাত যেমন ইবাদত, তেমনি অন্যান্য হালাল কাজও ইবাদত। তাই প্রতিটি ইবাদত সম্পাদনেই তাকে ধৈর্য ধরতে হবে। যে যত বেশি ইবাদত করবে তার উপর পরীক্ষা তত বেশী চাপানো হবে। সে ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই ধৈর্য ধারণ করতে হবে। আর এর মাধ্যমে তার গুনাহ সমূহ মাফ হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা:) বলেন “মানুষকে তার ধর্মানুরাগের অনুপাত অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যে ব্যক্তি তুলনামূলক বেশি ধার্মিক তার পরীক্ষাও তদানুপাতে হয়ে থাকে। আর কেউ যদি তার দ্বীনের ব্যপারে শিথিল থাকে, তাহলে তাকে তদনুপাতেই পরীক্ষা করা হয়। অতএব বান্দার উপর বিপদাপদ লেগেই থাকে। অবশেষে তাকে এমন এক অবস্থায় ছেড়ে দেয় যে, সে জমিনে চলাফেরা করে অথচ তার কোন গুনাহ থাকে না।”
(২) পাপ কাজ হতে বিরত থাকার ক্ষেত্রে ধৈর্য : নেক আমলের জন্য যেমন ধৈর্যের প্রয়োজন। তেমনি পাপ কাজ হতে বিরত থাকার জন্যও ধৈর্যের প্রয়োজন। কেননা একজন নেককার বান্দাকে প্রতিনিয়ত নফসের সাথে জেহাদ করে পাপ থেকে মুক্ত থাকতে হয়। এ ক্ষেত্রে ধৈর্য ব্যতীত তা সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা:) বলেন “যদি দৃঢ় বিশ্বাস সহকারে সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহ ওয়াস্তে (প্রতিনিয়ত) নেক আমল করা তোমার পক্ষে সম্ভব হয় তা হলে তুমি তা করবে। আর যদি তুমি তাতে সমর্থ না হও তাহলে অপছন্দনীয় (পাপকাজ) বিষয়ে ধৈর্য ধারণে ও (বিরত থাকার ক্ষেত্রে) অধিক কল্যাণ রয়েছে।
(৩) দুনিয়াবী বিপদাপদে ধৈর্য : দুনিয়াবী বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করা ওয়াজিব। মুমিনের জন্য দুনিয়াবি বিপদাপদ হল পরীক্ষা স্বরূপ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন “অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করবো কিছু ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি এবং ফল ফসলে বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সু-সংবাদ দাও ছবর কারীদের যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তারই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।” (সূরা বাকারা- ১৫৫ ও ১৫৬)
(৪) জমিনের দ্বীন কায়েমের কাজে ধৈর্য ঃ আল্লাহ জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের কাজে চরম ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিতে হয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলে “তোমরা কি ভেবে নিয়েছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে। অথচ আল্লাহ এখনও পরীক্ষা করেনি। তোমাদের মধ্যে কে জেহাদ করেছে আর কারা ধৈর্যশীল” (সূরা-ইমরান- ১৪২)। অন্যত্র বলেন “তোমরা মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে- অথচ এখনও তোমাদের নিকট তোমাদের পূর্ববর্তীদের অনুরূপ অবস্থা আসেনি? তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট আর এমনি ভাবে শিহরিত হয়েছে যাতে নবী ও তার প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে পর্যন্ত এ কথা বলতে হয়েছে যে, কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য। তোমরা শুনে নাও আল্লাহর সাহায্য একান্ত নিকটবর্তী।” (সূরা-বাকারা- ২১৪)
(৫) দুনিয়ার চাওয়া পাওয়ার ক্ষেত্রে ধৈর্য ঃ এ দুনিয়াতে দরিদ্রের কষ্ট হয় ধনীর সম্পদ দেখলে। ধনীদের জাঁকজমক পূর্ণ জীবন উপকরণ দেখে অনেক দরিদ্র ঈমানদার ধৈর্য হারা হয়ে যায়। মূলত মহান আল্লাহ ধনীদের পার্থিব জীবন উপকরণ দিয়েছেন তাদের পরীক্ষার জন্য। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন “আপনি কখনও আপনার চক্ষুদ্বয়ের মাধ্যমে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না- ঐ সকল ব্যক্তিদের পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য ও ভোগ বিলাসের দিকে- যা আমি তাদের দিয়েছি পরীক্ষার জন্য। আপনার পালনকর্তার দেওয়া রিযিক উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী।” (সূরা ত্বোয়া-হা-১৩১)। মূলত: পার্থিব জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা রিযিক ও জীবন উপকরণ দেওয়া হবে তার উপর সন্তুষ্ট থেকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
(৬) সন্তান-সন্ততির মৃত্যুর ক্ষেত্রে ঃ সন্তান-সন্ততির মৃত্যুর ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা অত্যন্ত কষ্টের হলেও তার বিনিময় হল একমাত্র জান্নাত। হাদিসে কুদসীতে মহান আল্লাহ বলেন “আমি যখন আমার মুমিন বান্দার অকৃত্রিম ভালবাসার পাত্রকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেই এবং তাতে সে ধৈর্য ধারণ করে- ছওয়াবের আশা রাখে, আমার কাছে তার বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।” রাসূল (সা:) বলেন “যখন বান্দার কোন সন্তান মারা যায়। তখন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের বলেন, তোমরা আমার বান্দার সন্তান কেড়ে নিয়ে এসেছ? তারা বলে হ্যাঁ। এরপর তিনি বলেন, তোমরা আমার বান্দার কলিজার টুকরো ছিনিয়ে এনেছ? তারা বলে হ্যাঁ, অত:পর জিজ্ঞেস করেন, আমার বান্দা কী বলেছে? তারা বলে, সে আপনার প্রশংসা করেছে এবং বলেছেন “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।” আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করবো। আল্লাহ তায়ালা বলেন আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরী কর এবং তার নাম দাও “বায়তুল হামদ” বা প্রশংসার ঘর।” একদা রাসূল (সা:) সাহাবাদের জিজ্ঞাসা করেন “তোমরা কাকে নিঃসন্তান মনে কর? তারা বলল যার কোন সন্তান হয় না। তিনি বললেন-সে নিঃসন্তান নয় বরং (আখেরাতের ক্ষেত্রে) ঐ ব্যক্তি নিঃসন্তান যার মৃত্যুর পূর্বে তার কোন সন্তানের মৃত্যু হল না। রাসূল (সা:) আরও বলেন- “ঐ সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার জীবন। গর্ভচ্যুত বাচ্চা ও তার মাকে আঁচল ধরে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে। যদি এর দ্বারা তার মা আখেরাতে সওয়াবের আশা করে থাকে। রাসূল (সা:) এর নিকট তিন সন্তান দাফনকারী এক মহিলা আগমন করে বিস্তারিত বলেন, রাসূল (সা:) বলেন- তুমি জাহান্নামের আগুনের প্রতিরোধকারী মজবুত প্রাচীর দ্বারা সংরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করেছ”। সুতরাং সন্তান-সন্ততি বা প্রিয় জনের মৃত্যুতে আমাদের ধৈর্য ধারণ করা এবং মহান আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকা উচিত।
(৭) রোগ-ব্যাধী ও অন্ধত্বের ক্ষেত্রে ধৈর্য ঃ মহান আল্লাহ ঈমানদারকে বিভিন্ন রোগ ব্যাধী প্রদানের মাধ্যমে গুনাহ মাফের সুযোগ করে দেন। তাই এ ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা অবশ্যই কর্তব্য। রাসূল (সা:) বলেছেন “হাপর যেমন লোহার মরিচা দূর করে তেমনি জ্বর আদম সন্তানের গুনাহ সমূহ দূর করে দেয়।” মূলত কোন প্রকার অসুখ না হওয়া জাহান্নামীর লক্ষণ। একদা রাসূল (সা:) এর নিকট এক গ্রাম্য ব্যক্তি আগমন করলে রাসূল (সা:) তাকে জিজ্ঞেস করলেন তোমার কি “উম্মু মিলদাম” (এক ধরনের জ্বর) হয়েছে? সে বলল, উম্মু মিলদাম আবার কী? তিনি বললেন এটা চর্ম ও গোশতের মধ্যকার তাপমাত্রা (অর্থাৎ জ্বর)। সে বলল না। রাসূল (সা:) বললেন তোমার কি মাথা ব্যথ্যা হয়? লোকটি বলল মাথা ব্যথ্যা আবার কী? তিনি বললেন, এটা এক প্রকার বাতাস যা মাথায় প্রবেশ করে এবং শিরা-উপশিরায় আঘাত হানে। সে বলল, এটা আমার হয়না। এর পর লোকটি যখন উঠে দাঁড়াল তখন নবী (সা:) বললেন যে ব্যক্তি কোন জাহান্নামীকে দেখে আনন্দ পায় সে যেন এই লোকটিকে দেখে নেয়। কেউ যদি চোখ হারিয়ে ধৈর্য ধারণ করে তবে মহান আল্লাহ তাকে জান্নাত দিবেন। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা:) বলেন “আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি আমার বান্দা থেকে তার প্রিয় বস্তু তথা চোখ কেড়ে নিলে যদি সে তাতে ধৈর্য ধারণ করে, তাহলে আমি তাকে একমাত্র জান্নাত দেওয়া ছাড়া অন্য কিছু প্রদানে সন্তুষ্ট নই।
(৮) শত্র“র নিপীড়নে ধৈর্য ধারণ ঃ মুমিনবান্দার জন্য শত্র“র শত্র“তাও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। এ ক্ষেত্রেও অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। আর এ ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ পূর্বক মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিবেন। রাসূল (সা:) বলেন “যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এমন মর্যাদা নির্ধারণ করা থাকে, যা সে তার আমল দ্বারা পাওয়ার যোগ্যতা রাখেনা, তখন আল্লাহ তাকে তার শরীর অথবা তার সম্পদ কিংবা তার সন্তান সন্ততির প্রতি বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন এবং তাকে ঐ বিপদের উপর ধৈর্যধারণ করার ক্ষমতা দেন। অত:পর তাকে নির্ধারিত ঐ স্থান ও মর্যাদায় পৌছে দেন।”
(৯) ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে ধৈর্য ঃ ধৈর্যধারণ করা ব্যতীত ইলম অর্জন সম্ভব নয়। যারা ইলম অর্জনের মাধ্যমে দুনিয়াবাসীর জন্য অবদান রেখেছেন তাদেরকে চরম ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছিল। ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারনের বিষয়ে হযরত খিযির (আ:) এবং হযরত মূসা (আ:) এর মাঝে যে কথোপকথন হয় তা পবিত্র কোরআনের সূরা কাহফে মহান আল্লাহ উল্লেখ করেন। খিযির (আ:) কে মূসা (আ:) বলেন “আপনি কিছুতেই আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। আর আপনি কিভাবে সে বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করবেন যে বিষয়ের জ্ঞান আপনার নাই।” (সূরা-কাহফ-৬৮)। উত্তরে মূসা (আ:) বলেন “আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোন আদেশ অমান্য করবো না”। (সূরা-কাহফ-৬৯)। উক্ত আয়াতগুলোর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় ইলম অর্জনের জন্য ধৈর্য ধারণ পূর্বক কষ্ট স্বীকার করা অত্যন্ত জরুরী।
(১০) মেজাজ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ধৈর্য ঃ মানুষের মেজাজ নিয়ন্ত্রিত হয় তার ব্রেন বা মস্তিষ্ক হতে। ১৯২৯ সালে বিখ্যাত ব্্েরন বিজ্ঞানী ডাক্তার হ্যান্স বার্জার ইলেকট্রো এনসেফেলোগ্রাম (ইইজি) যন্ত্র দ্বারা মানুষের ব্রেনের ওয়েভ বা তরঙ্গ পরিমাপ করে এর ফ্রিকোয়েন্সি কে ৫ ভাগে ভাগ করেন। মানুষ যখন গভীর নিদ্রা বা গভীর ধ্যানে থাকে তখন ব্রেন ওয়েভ এর পরিমাণ থাকে ০.৫-৩ সাইকেল, এই লেভেলকে বলা হয় ডেল্টা লেভেল। মানুষের নিদ্রার পূর্ব মূহুর্তে ব্রেন ওয়েভের পরিমাণ থাকে ৪-৭ সাইকেল, এই লেভেল কে বলা হয় থিটা লেভেল। মানুষের মনে যখন প্রশান্ত থাকে তখন ব্রেন ওয়েভ এর পরিমাণ থাকে ৮-১৩ সাইকেল, এই লেভেলকে বলা হয় আলফা লেভেল। মানুষ যখন দুশ্চিন্তা বা প্রচন্ড টেনশনে থাকে তখন ব্রেন ওয়েভ এর পরিমাণ থাকে ১৪-২৬ সাইকেল, এই লেভেলকে বলা হয় বিটা লেভেল। মানুষ যখন প্রচন্ড উত্তেজিত থাকে তখন ব্রেন ওয়েভ এর পরিমাণ থাকে ২৭ সাইকেল এর উপরে, এই লেভেলকে বলা হয় গামা লেভেল। যখন দাঁড়ানো অবস্থা কোন মানুষ প্রচন্ড উত্তেজিত থাকে তখন তার মেজাজ গামা লেভেলে থাকলেও সে যদি বসে পড়ে তবে অল্প সময়ের মধ্যে তার মেজাজের লেভেল বিটা লেভেলে পৌছে যাবে। আর শায়িত হলে খুব দ্রুত আলফা লেভেলে চলে যাবে। রাসূল (সা:) বলেন “তোমরা যদি দাঁড়ানো অবস্থায় উত্তেজিত হও তবে বসে যাও। আর যদি বসা অবস্থায় উত্তেজিত হও তবে শোয়ে পড়।” হযরত লোকমান (আ:) তার ছেলেকে বলেন “হে বৎস তিনটি জিনিস তিনটি স্থানে ছাড়া চেনা যায় না: (র) ক্রোধের সময় ছাড়া ধৈর্যশীলকে চেনা যায় না (রর) যুদ্ধক্ষেত্রে ছাড়া বীরকে চেনা যায় না এবং (ররর) প্রয়োজনের সময় ছাড়া প্রকৃত ভাইকে চেনা যায় না। তাই যে কোন সময় মেজাজ নিয়ন্ত্রণে ধৈর্যধারণ করা অপরিহার্য।
ধৈর্য এর তাৎপর্য:
তাৎপর্য শব্দের ইংরেজী প্রতিশব্দ হল ঝবহপব, এরংঃ, গবধহরহম, রহঃবহঃ, ধনলবপঃ, ওহঃবহঃরড়হ, চঁৎঢ়ড়ংব, ঝরমহরভরপধহপব ইত্যাদি। যার অর্থ মর্ম, বোধ, সারাংশ, অভিপ্রায়, উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা, অন্তনিহিত উদ্দেশ্য ইত্যাদি। ধৈর্যের তাৎপর্য বলতে ধৈর্যের উদ্দেশ্য বা অভিপ্রায়কে বুঝায়। এই পৃথিবীতে আদম সন্তানের জন্য ধৈর্য হল এক অত্যাবশ্যকীয় পালনীয় বিষয় যা জীবন পরিচালনা ও সফলতার জন্য অত্যন্ত জরুরী। এছাড়া ইসলামী শরিয়তের আলোকে একজন মুসলমানের উপর ধৈর্যধারণ কে অত্যাবশ্যকীয় করার অনেক তাৎপর্য রয়েছে। নিন্মে তার কয়েকটি দিক আলোকপাত করা গেল:-
(১) বান্দাকে দুনিয়াতে পরীক্ষার মাধ্যমে পাপ মুক্ত করা ঃ মহান আল্লাহ অসীম দয়ালু। তাই তিনি বান্দাদের অপরাধের কারণে আখেরাতে জাহান্নাম প্রদানের পরিবর্ততে দুনিয়াতে বিপদ-মুছিবত দিয়ে অনেক বড় বড় পাপ মোছনের ব্যবস্থা করেন। বিপদকালীন সময়ে যে সকল বান্দা স্বাভাবিক অবস্থার ন্যায় মহান আল্লাহর উপর ধৈর্যের মাধ্যমে সন্তুষ্ট ও শোকর গোজার থাকেন আল্লাহ তাদের পাপ মুক্ত করে মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।
(২) বান্দাকে আল্লাহর মুখাপেক্ষী করা ঃ মানুষ বিপদের সময় আল্লাহকে যতটা স্মরণ করে সুখের সময় ততটা করে না। মানুষ যদি সবসময় সুখে থাকে তবে আল্লাহর স্মরণ ও তার মুখাপেক্ষী হতে সম্পূর্ণ ভাবে মুখ ফিরিয়ে নিবে। তাই মহান আল্লাহ মানুষকে তার মুখাপেক্ষী করার জন্য একটা নয় একটা সমস্যার মধ্যে সবসময় রাখে। ঐ সকল মানুষই তার প্রকৃত বান্দা যারা সুখে দুঃখে সব সময় তার মুখাপেক্ষী থাকে।
(৩) অহংকার মুক্ত করা ঃ কোন মানুষ সমস্যা মুক্ত থাকলে সে অবশ্যই অহংকারী হয়ে উঠবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন “আর যদি তার উপর আপতিত দুঃখ ও কষ্টের পরে তাকে সুখ ভোগ করতে দেই, তবে সে বলতে থাকে যে, আমার অমঙ্গল দূর হয়ে গেছে আর সে আনন্দে আত্মহারা হয়। অহংকারে উদ্ধৃত্ত হয়ে পড়ে। তবে যারা ধৈর্যধারণ করেছে এবং সৎ কার্য করেছে তাদের জন্য ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান রয়েছে।” (সূরা হুদ-১০-১১)। তাই মহান আল্লাহ মানুষকে অহংকার মুক্ত রাখার জন্য দুঃখ কষ্ট নিপতিত করেন।
(৪) হারাম উপার্জন থেকে বিরত রাখা ঃ দরিদ্রতার কারণে মানুষ যদি ধৈর্য ধারণ না করে তবে সে অবশ্যই হারাম উপার্জনে মনোনিবেশ করবে। একজন দারিদ্র ব্যক্তি কেবল ধৈর্যধারণ করার মাধ্যমেই হারাম উপার্জন থেকে নিজেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়।
(৫) প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমার মানসিকতা সৃষ্টি করা ঃ প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করার গুরুত্ব স¤পর্কে রাসূল (সা:) বলেন “মহান আল্লাহ বান্দাদের মাঝে ঐ সকল ব্যক্তিদের সবচাইতে বেশি ভালবাসেন। যারা প্রতিশোধ নেওয়ার পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যকে ক্ষমা করে দেয়।” আর ধৈর্য এমন এক মহৎ গুনাবলী যা মানুষের মাঝে ক্ষমাশীলতার যোগ্যতা সৃষ্টি করে।
(৬) সৎ ও অসৎ লোক বাচাই করা ঃ ধৈর্য ধারণ করার মাধ্যমেই চারিত্রিক সততা ও অসততা ফুটে উঠে। যার মাঝে ধৈর্যের গুনাবলী নেই তার মাঝে সততার গুনাবলীও থাকতে পারে না। অসৎ লোক কখনও ধৈর্যশীল হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন “অসৎ কে সৎ হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছ আল্লাহ মুমীনগণকে সে অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারে না।” (সূরা-ইমরান- ১৭৯ আংশিক)
(৭) শত্র“র ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত রাখা ঃ মহান আল্লাহ বান্দাকে তখনই শত্র“র ষড়যন্ত্র হতে মুক্ত রাখবেন যখন সে ধৈর্যশীল হবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন- “তোমরা যদি ছবর ও তাকওয়া অবলম্বন করো তবে শত্র“দের শত্র“তা মূলক কলাকৌশল তোমাদের বিন্দু মাত্র ক্ষতি সাধন করতে পারবে না।” (সূরা ইমরান-১২০)
(৮) ক্রোধকে সংবরণ করা ঃ ক্রোধ মানব চরিত্রের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য। ক্রোধের বশীভূত হয়েই মানুষ অনেক জঘন্য অপরাধ করে। আর ক্রোধকে দমন করার উপায় হলো “ছবর”। একই চরিত্রে ক্রোধ ও ছবর সহ অবস্থান করতে পারে না।
(৯) হাতাশাগ্রস্থতা থেকে মুক্ত রাখা ঃ মানুষ সামান্য বিপদে হাতাশায় নিমর্জ্জিত হয়। অথচ হতাশা কবিরা গুনাহ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন “তুমি ধৈর্যধারণ কর। তোমার ধৈর্যতে আল্লাহরই সাহায্য। তাদের জন্য দুঃখ করো না এবং তাদের ষড়যন্ত্রে তুমি মন:ক্ষুন্ন হয়ো না।” (সূরা-নাহল-১২৭)। অন্যত্র বলেন “তোমরা হীনবল হয়োনা এবং চিন্তান্বিত হয়ো না। তোমরাই বিজয়ী, যদি তোমারা মুমীন হও।” (সূরা-ইমরান-১৩৯)
(১০) জান্নাতী বাছাইয়ের পরীক্ষা নেওয়া ঃ “ছবর” বান্দার জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতি যাচায়ের পরীক্ষা যে বান্দা ছবরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে সে জান্নাতী হবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন “আর তাদের ধৈর্যধারণের কারণে তাদের পুরস্কার হবে জান্নাত ও রেশমী পোশাক”। (সূরা দাহর-১২)। অন্যত্র বলেন “আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে আমি অবশ্যই তাদের জান্নাতের সু-উ”” প্রাসাদে স্থান দেব, যার তলদেশে প্রস্রবণ সমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। কতই না উত্তম পুরষ্কার তাদের জন্য। যারা ছবর করে এবং তাদের পালন কর্তার উপর ভরসা করে।” (সূরা-আনকাবুত-৫৮-৫৯) অন্যত্র বলেন “যারা নির্যাতিত হবার পর হিজরত করেছে, অত:পর জিহাদ করেছে, ও ছবর করেছে, নিশ্চয়ই তোমার পালনকর্তার এসব কিছুর পর (তাদের ব্যাপারে) অবশ্যই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা- নাহর-১১০)
শেষ কথা:
পরিশেষে ধৈর্যের উপর দীর্ঘ আলোচনায় আমরা এ বিষয়ে স্পষ্ট হলাম যে, ধৈর্যশীল না হওয়া ব্যতীত জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে না। তবে যে কোন বিষয়ে ধৈর্য ধরতে হবে প্রাথমিক অবস্থায়। রাসূল (সা:) বলেছেন “প্রকৃত ধৈর্য তাকেই বলে যা প্রথমেই অবলম্বন করা হয়ে থাকে।” রাসূল (সা:) ধৈর্যকে আলোর সাথে তুলনা করে বলেন- সালাত হলো “জ্যোতি”। সাদকাহ হলো “প্রমাণ”। ছবর হলো “আলো”। আর কোরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষের দলিল”। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে দুনিয়াতে মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বিভিন্ন ভাবে মুসিবতের ফয়সালা করেন- যাদেরকে তিনি আখেরাতে শাস্তি প্রদানের ইচ্ছা রাখেন না। আর যাদের আখেরাতে শাস্তি প্রদানের ইচ্ছে পোষন করেন তাদের দুনিয়াতে অনেক সুখে শান্তিতে রাখেন। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা:) বলেন “আল্লাহ যখন কোন বান্দার কল্যাণ চান দুনিয়াতে তাকে দ্রুত শাস্তি দেন। আর যখন কোন বান্দার অকল্যাণ চান তখন তাকে শাস্তি প্রদান থেকে বিরত থাকেন। যাতে তিনি কেয়ামত দিবসে পূর্ণভাবে দিতে পারেন।” এই হাদীসের আলোকে বুঝা যায় যে, মুসীবত হলো মুমীনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের হাদিয়া-যা আখেরাতের ভয়াবহ আযাব থেকে মুক্তির জন্য সহায়ক। তবে তার জন্য প্রয়োজন সকল মুছীবতে ধৈর্য ধারণ করা ও আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট থাকা। আসুন আমরা সকল ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে মহান আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট চিত্তে তার গোলামী করি এবং তার জমিনে তার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করি।
লেখক- সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, লাকসাম উপজেলা পরিষদ ও
অধ্যক্ষ, লাকসাম ক্যামব্রিয়ান স্কুল এন্ড কলেজ, লাকসাম।

Share.

Leave A Reply