ফারুকী হত্যার দায় স্বীকার জেএমবির

0

টেলিভিশনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও হাইকোর্ট মাজার জামে মসজিদের খতিব নূরুল ইসলাম ফারুকীকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে নিষিদ্ধ সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ এবং টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর হামলা বা হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জেএমবি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। রিমান্ডে থাকা জেএমবির ভারপ্রাপ্ত আমীর আবদুল্লাহ আল তাসনিম ওরফে নাহিদসহ ৭ জঙ্গি গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এই তথ্য দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা আল কায়দার শীর্ষ নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরির ভিডিও বক্তব্য ও ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে। জেএমবি এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে বহির্বিশ্বের জঙ্গি সংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিল।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, ফারুকীকে খুনের দায় স্বীকার করেছে জেএমবি। তবে কিলিং মিশনে কারা কিভাবে কাদের নির্দেশে কতজন অংশ নিয়েছিল এ বিষয়ে তারা কিছু বলেনি। তাদের মুখোমুখি করে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন তিনি।
২৭ আগস্ট ঢাকার ১৭৪, পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় ফারুকীকে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়। গোয়েন্দারা এই হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকেই ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের সম্পৃক্ততার কথা বলে আসছিলেন। ডিবি পুলিশের উপ-কমিশনার জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর যুগান্তরকে বলেন, সাধারণত মতাদর্শগত বিরোধের কারণে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার প্রবণতা দেখা যায়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থী সংগঠনগুলোর মধ্যে মতাদর্শগত বিরোধের কারণে গলা কেটে হত্যার প্রবণতা রয়েছে। এছাড়া ঢাকার গোপীবাগের আরকে মিশন রোডের ৬৪/৬ নম্বর বাসায় গত বছরের ২১ ডিসেম্বর, মুরিদ সেজে ঢুকে পীর লুৎফর রহমান ফারুক, তার ছেলে সারোয়ার ইসলাম ফারুক ওরফে মনির, পীরের খাদেম মঞ্জুর আলম মঞ্জু, মুরিদ মো. শাহিন, রাসেল ও মুজিবুল সরকারকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
একই স্টাইলে ২৭ আগস্ট চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় ‘কাফেলা’ নামক ইসলামিক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক শাইখ নুরুল ইসলাম ফারুকীকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার সময় ফারুকীর বাসার অন্যদের হাত-পা বেঁধে রাখলেও তাদের হত্যা করা হয়নি। শুধু হত্যা করা হয় ফারুকীকে। গত বছরের ১৫ ফেব্র“য়ারি পল্লবী থানার পলাশনগরে ব্লগার রাজিব হায়দারকে জবাই করে হত্যা করা হয়। রাজিব হত্যায় জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমকে শনাক্ত ও ঘাতকদের গ্রেফতার করা হয়েছে। ফারুকী হত্যার দায় জেএমবি স্বীকার করায় গোপীবাগের সিক্স মার্ডারের রহস্যও উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন গোয়েন্দারা। এর আগে জঙ্গিদের টার্গেট কিলিংয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দীপ আজাদ। জেএমবি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফারুকীর মেঝো ছেলে আহমাদ রেজা ফারুকী যুগান্তরকে বলেন, জেএমবি তার বাবাকে খুন করেছে এটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ ভিভিআইপি ও ভিআইপি এবং সুফিবাদে বিশ্বাসী নেতা হত্যার পরিকল্পনা করেছিল উগ্রপন্থীরা। তার বাবাও সুফিবাদ ও সুন্নিয়াতের কথা বলতেন, মাজার জেয়ারত, মিলাদম, ক্বিয়ামের পক্ষে কথা বলতেন। এসব কারণে তিনি ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের টার্গেটে ছিলেন। উগ্রপন্থীরা বেশ কয়েক দফায় তার বাবাকে ফেসবুকসহ বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়েছিল। রেজা আরও বলেন, শুধু জেএমবির সদস্যদের দায় স্বীকারই যথেষ্ট নয়, এ হত্যাকাণ্ডে কারা পরিকল্পনা করেছে, তাদের পেছনে কারা শক্তি জুগিয়েছে তাদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
জেএমবির সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে ডিবির প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, জেএমবি খুবই সংগঠিত এবং তাদের সাংগঠনিক ভিত অনেক মজবুত। তারা সম্প্রতি আল কায়দাপ্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরির অডিও বার্তা এবং আইএসের সফলতায় উৎসাহী হয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এমনকি দেশের দুর্গম অঞ্চলেও জেএমবির সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে। বিশেষ করে দেশের উত্তরবঙ্গে তারা খুবই শক্তিশালী অবস্থানে আছে। টার্গেটেড ও কমিটেড কিলিং এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা ছিল তাদের শক্তি বাড়ানোর আরও একটি কৌশল। তাদের মোকাবেলায় পুলিশের সক্ষমতা আরও বাড়ানো এবং পৃথক ইউনিট গঠনের কথাও বলেন তিনি। জেএমবি দেশের বাইরে থাকা জঙ্গি সংগঠনগুলো থেকে কোনো আর্থিক বা অস্ত্র সহযোগিতা পেয়েছিল কিনা এ প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, সে ধরনের তথ্য তারা এখনও স্বীকার করেনি। সাধারণ দেশের এনজিওগুলো যেভাবে ভালো কাজের উদাহরণ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ফান্ড সংগ্রহের চেষ্টা করে জেএমবিও সেভাবে চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। তারা বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছিল। তাদের অনেকেই তথ্যপ্রযুক্তি ও মোবাইল ট্রেকিংসহ টেকনিক্যাল বিষয়ে দক্ষ। তারা ইন্টারটেনের ভাইভার, স্কাইপে, টুইটারসহ বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে বহির্বিশ্বের জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আসছে।
শুক্রবার ভোররাতে জেএমবির ভারপ্রাপ্ত আমীর আবদুল্লাহ আল তাসনিম ওরফে নাহিদসহ জেএমবির সদস্য নাঈম আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সিকান্দার আলী ওরফে নকি, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহমুদ ইবনে বাশার, মাসুম বিল্লাহ, ফুয়াদ হাসান ও আলী আহম্মদকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তুরাগ থানায় দায়ের হওয়া দুটি মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দা পুলিশ।

Share.

Leave A Reply