বিএনপির পক্ষে হেফাজতের প্রচারণা!

0

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে ছদ্মবেশে প্রচারণায় নেমেছ‌‌‌েন হেফাজত নেতারা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা ও হেফাজতের পাশাপাশি ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও কার্যক্রম নেই হেফাজতের। মূলত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা হেফাজতের পরিচয় দিয়ে প্রার্থীর সঙ্গে গণসংযোগ করছ‌‌‌েন। হেফাজত নেতারা মূলত মসজিদ, মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বিভিন্ন স্থানে আদর্শ ঢাকা আন্দোলন মনোনীত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও মির্জা আব্বাসের সমর্থনে ভোট চাইছেন। এছাড়া জোটের প্রচারণার টিমের সঙ্গে সরাসরি থেকেও কোথাও কোথাও নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।

বিগত সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল ও খুলনার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হেফাজতে ইসলাম ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দিয়েছিল। নির্বাচন পরবর্তী বিশ্লেষণে চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবির কারণ হিসেবে হেফাজতের নাম আলোচনায় উঠে আসে। ওই সময়ে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা যোগ দেয় হেফাজতের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। হেফাজতও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সমর্থন ঘোষণা করে। চার সিটির নির্বাচনে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে প্রার্থীদের হয়ে প্রচারণা চালায় হেফাজতের নেতা-কর্মীরা। ওই সময়ে গণজাগরণ মঞ্চকে ঘিরে ‘নাস্তিক’ ইস্যুতে ছিল হেফাজতের তৎপরতা। ঘরে-ঘরে গিয়ে আওয়ামী লীগকে ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে প্রচারণা চালায় হেফাজত কর্মীরা৷

সরেজমিনে জানা গেছে, এবারের তিন সিটি নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনও তৎপরতা নেই হেফাজতের। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা হেফাজতের পরিচয় কাজে লাগিয়ে প্রচারণায় নেমেছেন। নিজেদের দলীয় পরিচয়ের আড়ালে হেফাজতের নামে মাঠে নেম‌‌েছ‌‌‌েন। কার্যত নিষ্ক্রিয় হেফাজতে ইসলামের নাম পরিচয় ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয় নিশ্চিত করতে ‘নাস্তিক’ ইস্যু নিয়ে সক্রিয় তারা। এক্ষেত্রে বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর মোহাম্মদ (স), হজ ও তাবলীগ নিয়ে মন্তব্য ও তার বিচারের দাবিকে কাজে লাগানো হচ্ছে ।

গত ১৮ মার্চ নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। তফসিল অনুসারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৮ এপ্রিল। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৬টি ওয়ার্ডে ভোটার রয়েছেন ২৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৩ জন। আর দক্ষিণে ৫৭টি ওয়ার্ডে ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৬৩ জন ভোটার। চট্টগ্রামের ৪১টি ওয়ার্ডের ১৮ লাখ ২২ হাজার ৮৯২ জন ভোটার রয়েছে।

জানা গেছে, তিন সিটি নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে থাকবে হেফাজত। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-এর সিনিয়র সহসভাপতি, হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী আদর্শ ঢাকা আন্দোলন মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে হেফাজতের তৎপরতা চালাতে দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। কর্মপদ্ধতি ঠ‌‌‌িক করতে আদর্শ ঢাকা আন্দোলনে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন, তাবিথের বাবা ও বিএনপি নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টুসহ জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে বৈঠক করেছেন। এর আগে গত ১৭ এপ্রিল হেফাজত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন খালেদা জিয়া। মাওলানা নূর হোসেন কাসেমীর নেতৃত্বে পাঁচ হেফাজত নেতা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে খালেদার সঙ্গে বৈঠক করেন।

সূত্রমতে, হেফাজত নেতারা কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ত‌‌‌াদের প্রচারণায় তুলে ধরা হচ্ছে আওয়ামী লীগের অধীনে মুসলিম পরিচয়ে মুক্তভাবে চলাফেরা করা সম্ভব নয়। কথায়-কথায় ‘জঙ্গিবাদে’র দায় আসে আলেমদের ওপর, নাস্তিক্যবাদের পৃষ্ঠপোষক এই সরকার। বিএনপি জোটে ভোট দিলে মসজিদ-মাদ্রাসায় নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসার আলেমদের আওয়ামী লীগ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তাদের দাবি, বিএনপি কোনও ইসলামি সংগঠন না হলেও মুসলমানদের স্বাধীন ধর্মকর্মে বাধা দেয় না। সেজন্য ঢাকা উত্তর সিটিতে তাবিথ আউয়ালকে বাস মার্কায় এবং দক্ষিণে মির্জা আব্বাসকে মগ মার্কায় ভোট দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয় হেফাজতের প্রচারণায়৷

হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, হেফাজতের পক্ষে থেকে কারও জন্য ভোট চাওয়া হচ্ছে না। হেফাজতের এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেই ভ‌‌‌োট চাওয়ার। তবে হেফাজতের অনেক নেতা রাজনীতি করেন, তারা ব্যক্ত‌‌‌িগতভাবে নির্বাচনের মাঠে থাকতে পারেন। তার মানে এই নয়, হেফাজত আছে নির্বাচনি প্রচারণায়। ব্যক্তিগত পরিচয়ের বাইরে কেউ হেফাজতের নাম ব্যবহার করছে এমনটি আমার জানা নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আদর্শ ঢাকা আন্দোলন মনোনীত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও মির্জা আব্বাসের সমর্থনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণসংযোগ করছেন। প্রচারণায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ নেতা হেফাজতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাদের মধ্যে রয়েছেন হেফাজতের ঢাকার প্রচার সেলের সদস্য ও কেন্দ্রীয় জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মহিউদ্দীন ইকরাম, হেফাজতের ঢাকার প্রচার সেলের সদস্য ও জমিয়তের প্রচার সম্পাদক ওয়ালী উল্লাহ আরমান, হেফাজত নেতা ও জমিয়তের ঢাকা মহানগর সহ-সভাপতি মাওলানা নাজমুল হাসান প্রমুখ। এই নেতাদের সরাসরি উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের সঙ্গে থেকে গণসংযোগ করতে দেখা গেছে।

বিশ দলীয় জোটভুক্ত ইসলামী ঐক্যজোটের ন‌‌‌েতারাও হেফাজতের পরিচয়ে প্রচারণার মাঠে নেমেছেন। ইসলামী ঐক্যজোটের ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনীর নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় মতবিনিময় সভা, প্রচারপত্র, পোস্টার বিলি করা হচ্ছে । আবুল হাসানাত আমিনীও হেফাজতের নেতা। তার নেতৃত্বে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন মাওলানা আবুল কাশেম, মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল, মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, মাওলানা আলতাফ হোসাইন, মাওলানা ইসহাক, আনছারুর হক ইমরান, খোরশেদ আলম প্রমুখ।

বিশ দলীয় জোটভুক্ত আরেকটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল খেলাফত মজলিস। এই দলটির নেতারাও হেফাজত‌‌‌ের পরিচয়ে প্রচারণার মাঠ‌‌‌ নেম‌‌েছ‌‌‌েন। ঢাকা দক্ষিন ও উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও তাবিথ আউয়ালের পক্ষে তাদের দুটি টিম কাজ করছে।

এ প্রসঙ্গে হেফাজতে ইসলাম যুগ্ম মহাসচিব জুনাইদ আল হাবিব বলেন, এই নির্বাচনে হেফাজতের পক্ষ থেকে সমর্থন, প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন। তবে হেফাহতের নেতারাও ভোটার, তাই তারা ভোট দিতে পারেন যাকে খুশি। তেমনি ব্যক্তিগতভাবে কারও পক্ষে ভোট চাইতেও পারেন। তবে হেফাজতের নামে ভোট চাওয়ার সুযোগ নেই, যদি কেউ করেন, তবে ঠিক করেননি।

Share.

Leave A Reply