বৈশাখী ছোবলে সারাদেশে নিহত ৮, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

0

টানা দাবদাহের পর শনিবার রাতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নেমে আসে স্বস্তির বৃষ্টি। তবে এর সঙ্গে বয়ে যাওয়া কাল বৈশাখী ঝড় অনেককে কাঁদিয়েছে।

জানা গেছে, ঝড়ে উত্তরের জেলা দিনাজপুরে পাঁচজনসহ অন্তত আটজন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক। ঘূর্ণিঝড়ে কয়েক হাজার ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- দিনাজপুরে অন্তঃসত্ত্বা নারী, নানা-নাতিসহ পাঁচজন, রংপুর ও জয়পুরহাটে একজন করে এবং কুমিল্লায় এক শিশু।

দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, শনিবার রাত সাড়ে আটটা ও রাত ১১টায় দুই দফা ঝড়ে দেয়াল ধসে ও গাছচাপা পড়ে অন্তত পাঁচজন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হন।

নিহতদের মধ্যে চারজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন- ফুলবাড়ী উপজেলার খয়েরপুকুর গ্রামের মুকুল চন্দ্র রায়ের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মিতু রায় (২২), নবাবগঞ্জ উপজেলার হাতিশাল গ্রামের সিরাজুল ইসলাম (৬০), তার নাতী সাব্বির (৮) এবং চিরিরবন্দর উপজেলার কামারপাড়ার আলেয়া বেগম।

এছাড়া চিরিরবন্দরের সুকদেবপুর গ্রামে এক নারী নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে প্রশাসন চারজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

ঝড়ে শ’ শ’ ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। উপড়ে গেছে হাজার হাজার গাছ। লিচু ও আমের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বৈদুত্যিক খুঁটি ভেঙে দিনাজপুর সদর উপজেলার নশিপুর গ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

এছাড়া মহাসড়কের ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় দিনাজপুর-ঢাকা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। সৃষ্টি হয়েছে যানজট।

রংপুর প্রতিনিধি জানান, জেলায় কালবৈশাখীর তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে গাছচাপায় এক অটোরিকশা যাত্রী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো বেশ কয়েকজন।

শনিবার রাতে শহরের সাতমাথা-মীরবাগ এলাকায় গাছচাপায় অটোযাত্রীর মৃত্যু হয় বলে মাহীগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই আজিজুল ইসলাম জানান।

তবে হতাহতদের পরিচয় জানা যায়নি। নিহতের লাশ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

ঝড়ে উপজেলার কুমারগাড়ী, সাতগড়া, নখারপাড়া, পলিপাড়া, খষ্টি, বড় আলমপুর, ধুলগাড়ী, উজিরপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের বহু কাঁচা বাড়িঘর ভেঙে গেছে। উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছপালা। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা।

জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, জেলায় শনিবার রাতে প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে দেওয়াল চাপাপড়ে জাহিদুল ইসলাম (৩৬) নামের এক ব্যক্তি নিহত ও কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন।

আহতদের মধ্যে তিনজনকে জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালের ভর্তি করা হয়েছে। ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে জেলার অধিকাংশ এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত জাহিদুল একজন হোটেল শ্রমিক। শহরের বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হারাইল এলাকায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করে জয়পুরহাট বাস টার্মিনালের পার্শ্ববর্তী একটি হোটেলে তিনি চাকরি করতেন।

নিহতের বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। রাতেই তার মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে নিজ বাড়ি গাইবান্ধায় নিয়ে গেছে স্বজনেরা।

আনুমানিক রাত একটার দিকে হয়ে শুরু হয়ে প্রায় আধঘণ্টা স্থায়ী হয় এই ঝড় ও শিলাবৃষ্টি। এতে জনজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। জেলার পাঁচটি উপজেলার কমবেশি দুই সহস্রাধিক কাঁচা ও পাকা ঘরবাড়ির দেয়াল পড়ে গেছে। উড়ে গেছে অসংখ্য টিন ও খড়ের চালা।

ভেঙে ও উপড়ে পড়েছে শ’ শ’ বিভিন্ন গাছ ও গাছের ডালপালা। শতাধিক বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়ায় রাত থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে জেলার বিদ্যুৎ সংযোগ।

ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে চলতি মৌসুমে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার মাঠের পাকা বোরো ধান, পাট, কলাসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, জেলার দেবিদ্বার উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড়ে ফাতেমা আক্তার (৫) নামে একটি শিশু নিহত হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছেন ওই শিশুর খালা ও নানী।

শনিবার দিবাগত রাতে দেবিদ্বার পৌর এলাকার চাঁপানগর গ্রামের এ ঘটনা ঘটে।

নিহত ফাতেমা একই উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের ইয়াছিন মিয়ার মেয়ে। আহতরা হলেন-নিহতের নানী আবুল কাশেমের স্ত্রী রহিমা বেগম (৫০) ও খালা সোহেল মিয়ার স্ত্রী হোসেনেয়ারা বেগম (২০)।

স্থানীয়রা জানায়, শনিবার রাত দেড়টা থেকে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। রাত তিনটার দিকে দেবিদ্বার পৌর এলাকার চাঁপাপুর গ্রামের আবুল কাশেমের বসতঘরে উপর একটি তালগাছ উপরে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই ঘরচাপা পড়ে ফাতেমার মৃত্যু হয়।

ফাতেমা ঘটনার একদিন আগে তার নানার বাড়ি বেড়াতে এসেছিল। এ ঘটনায় আহত হয় ওই শিশুটির খালা ও নানী। আহতদের উদ্ধার করে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, জেলার সকল উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মাঝারি ধরনের কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শনিবার রাত আটটার পরপরেই এ ঝড় হয়।

ঝড় থামার পরেই শিলাবৃষ্টি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুড়া ও গাড়াগ্রাম ইউনিয়নে। শুধুমাত্র এ দুটি গ্রামেই ৩০০০’র বেশি পরিবারের ১০,০০০ ঘড়বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঝড়ে কয়েক হাজার গাছপালা উপড়ে পড়েছে। রাস্তার ওপর গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ায় মাগুড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়ক বন্ধ হয়ে যায়।

জেলা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী মির্জা রফিকুন নবী জানান, ঝড়ের কারণে রাতে সৈয়দপুর পাওয়ার হাউজ থেকে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়া হয়। রবিবার দিনভর ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামত করে পুনরায় সংযোগ দেয়ার কাজ চলছে।

এদিকে, নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ শওকত চৌধুরী রবিবার দুপুরে দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের মাঝে ১০০০ করে টাকা প্রদান করেছেন বলে জানালেও ক্ষতিগ্রস্তরা কোনো ত্রাণ পাননি বলে জানিয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী শিহাব মিয়া, নুর আলমসহ অনেকে এ দাবি করেন। তাদের দাবি, ত্রাণ দেয়া হলেও তারা কিভাবে দিয়েছেন, আমরা জানি না।

মাগুরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাহার হোসেন দুলাল জানান, তিনি ইউপি সদস্যদের মাধ্যেমে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করছেন। প্রাথমিকভাবে দুর্গতদরে মধ্যে চিড়া-গুড় বিতরণ করা হচ্ছে।

Share.

Leave A Reply