মূল সড়কে এলোপাতাড়ি পার্কিং, খানাখন্দ, বেদখল অবরুদ্ধ গুলশান বনানী

0

অবরুদ্ধ গুলশান-বনানী। অন্য কোনো কারণে নয়, দুঃসহ যানজটে নিত্য এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় রাজধানীর বনেদি ওই এলাকায়। শত শত গাড়ির এলোপাতাড়ি পার্কিং। রাস্তা, গলির সিংহভাগ বেদখল। রিকশাগুলোর তাণ্ডব তো লেগেই আছে। দিন, মাস নয়, বছরের পর বছর ধরে এ অবস্থা বিরাজ করলেও অভিজাত ওই এলাকাকে বিশৃঙ্খলামুক্ত করা যাচ্ছে না। ক্রমেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

গুলশান-বনানী-বারিধারার বেশির ভাগ এলাকা এভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে, স্থবির হয়ে পড়ছে জীবনযাত্রা। দিনের শুরুতে এ অভিজাত এলাকায় শুরু হওয়া যানজটের ধকলই ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে। সূত্রপাত ঘটে সবচেয়ে বড় নাগরিক যন্ত্রণার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও লিয়াজোঁ কার্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে গুলশান-বনানী-বারিধারাতেই। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসও রয়েছে। আছে নামিদামি শিক্ষা, বাণিজ্যিক ও কল কারখানার প্রধান কার্যালয়ও। ফলে হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, গ্রাহকসহ সব শ্রেণির মানুষের নিয়মিত যাতায়াত গুলশান-বনানীতে। তারা নিয়ে আসেন প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, পাজেরোসহ হরেক রকমের গাড়ি। এতসব গাড়ি বহনকৃত যাত্রীদের আবার ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আশপাশেই দিনভর পার্কিং করে রাখা হয়। ফলে পাঁচ সহস্রাধিক গাড়ির ভিড়ে সমগ্র গুলশান-বনানী সারা দিনই স্থবির থাকে।

সকালে স্কুল ও অফিসগামী যাত্রীদের যাত্রা থেকেই শুরু হয় যানজটের, দুপুরের মধ্যেই সে জট ভয়াবহতায় রূপ নেয়, তা ছড়িয়ে পড়ছে অলিগলি, মহল্লায়ও। শুধু গুলশান-বনানী এলাকা ঘুরে ফিরে আসতেও পুরো দিন লেগে যায়। মিনিবাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি, রিকশা ব্যবহার করেও কতক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছাবেন তা কেউ হলফ করে বলতে পারেন না। ট্রাফিক পুলিশ সূত্রগুলো জানায়, যে কয়েকটি পয়েন্টের যানজট পুরো রাজধানীর স্থবিরতার জন্য দায়ী তার মধ্যে অন্যতম গুলশান-বনানী।গুলশান-১ থেকে বাড্ডা ক্রসিং, গুলশান-২ থেকে নতুন বাজার ক্রসিং এবং গুলশান লিংক রোড এ তিনটি সড়ক রয়েছে এ এলাকায় যাতায়াতের জন্য।

এসব সড়কে এতটাই যানজট থাকে যে, প্রাইভেট কারের যাত্রীরা এ সড়কগুলো ব্যবহার না করতে পারলেই যেন বাঁচেন। গুলশান-বনানী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দু-চারটি বাদে আর কোনো অফিস প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব পার্কিং জোন নেই। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বহুতল ভবনের নিচে পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান থাকার কথা। গ্রাউন্ড ফ্লোর অথবা আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোর কেবল গাড়ি রাখার জন্যই নির্মাণের বিধান রয়েছে। গুলশান-বনানীতেও বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয় রাজউক। তাদের অনুমোদিত প্ল্যান নিয়েই ভবন নির্মিত হয়, থাকে না কেবল পার্কিং জোন। ভাঙাচোরা, খানাখন্দে পূর্ণ রাস্তাঘাটের অর্ধেকটাই বেদখল। যত্রতত্র শত শত গাড়ির এলোপাতাড়ি পার্কিং। প্রতিটি সড়কের যথেচ্ছ ব্যবহার। সর্বোপরি রিকশার তাণ্ডব তো আছেই। এসব কারণে যানজট নিরসনে বিভিন্ন সংস্থার নানামুখী উদ্যোগ-আয়োজনও এসব এলাকায় সুফল বয়ে আনতে পারছে না। সরেজমিনে দেখা যায়, বেশির ভাগ সড়কেই একাধিক সারিতে গাড়ি পার্কিং করে রাখা। গুলশানে অসংখ্য অফিস ও বাণিজ্যিক কার্যালয় থাকলেও কোনো ভবনে পার্কিংব্যবস্থা নেই। কোনো ভবনে সীমিত পার্কিংব্যবস্থা থাকলেও তা সংশ্লিষ্ট ভবনের অফিসগুলো ব্যবহার করতে পারে না। গুলশান-১ চত্বর থেকে গুলশান-২, শুটিং ক্লাব হয়ে তেজগাঁও-মহাখালী অভিমুখে যাওয়ার রাস্তা এবং গুলশান-২ থেকে বনানীর কাকলী মোড়মুখী প্রধান রাস্তাজুড়ে দিনভর এমনকি মধ্যরাত পর্যন্ত অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়। ব্যস্ততম এ রাস্তাগুলোর দুই পাশে দু-তিন সারিতে গাড়িগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার্কিং করে রাখা হয়।

পার্কিংয়ের বাইরে থাকা অবশিষ্ট কয়েক ফুট সড়ক দিয়ে গাড়িগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হয়। ফলে ধীরগতির কারণেই বেঁধে থাকে দীর্ঘ জট। ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা কয়েকটি গাড়ির স্টিকার দেখিয়ে বলেন, ‘এসব গাড়ির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সাধ্য আমার নেই।’ স্টিকারগুলোয় ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কাজে ব্যবহৃত’, ‘আইনি সহায়তা কেন্দ্র’, ‘সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী’, ‘পুলিশ’, ‘মন্ত্রণালয়ের কাজে নিয়োজিত’, ‘সরকারি ডাক্তার’ এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়নকারী একাধিক সংগঠনের নাম ইত্যাদি লেখা রয়েছে।রক্ষা হয়নি পার্কিং জোন : খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সিটি করপোরেশন নির্মিত নির্ধারিত পার্কিং জোনগুলোও রক্ষা করা যায়নি। অভিজাত এলাকা বনানী-গুলশানের গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানগুলো দখল করে হকারদের দোকানপাট ও স্থায়ী হাট-বাজার বসেছে।

গুলশান-২-এর ডিআইটি মার্কেটে গড়ে তোলা পার্কিংয়ের জায়গায় প্রায় ১৫টি ভাতের হোটেল, চা-পান-সিগারেটসহ ফলের দোকান গড়ে উঠেছে। এদিকে গুলশান ১ নম্বর উত্তর ডিসিসি পাকা মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, মালিক সমিতির অফিসের পেছনে খালি জায়গাটি হকারদের সম্পূর্ণ দখলে। ওপরে পলিথিন দিয়ে তারাও মার্কেট বানিয়েছেন।বেহাল অলিগলি : সাম্প্রতিককালে গুলশান, বারিধারা ও বনানী আবাসিক এলাকার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষকে যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ, যন্ত্রণা আর কষ্টের শিকার হতে হয়েছে, অতীত নিকটে তার কোনো নজির নেই। বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই এ অভিজাত এলাকাজুড়ে সাড়ে তিন ফুট ব্যাসের বিরাটাকৃতির পানির লাইন বসানোর জন্য শুরু হয় রাস্তা কাটা ও খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। সেই মান্ধাতা আমলের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে অদক্ষ শ্রমিকদের দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়কগুলো খোঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে বেহাল অবস্থা করে ফেলা হয়েছে।

রাস্তার গর্ত, খোলা ম্যানহোল, ভাঙা ড্রেন ও ইট-সুরকি উঠে যাওয়ায় এসব ডুবন্ত রাস্তা যেন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সেই হতশ্রী অবস্থা দূর হয়নি এখনো। গুলশান মডেল টাউনের প্রধান সড়ক ‘গুলশান অ্যাভিনিউ’ খানাখন্দ ও গর্তে ভরে গেছে। এক নম্বর সার্কেল থেকে শুটিং ক্লাব পর্যন্ত সড়কে ঢাকা ওয়াসা সম্প্রতি খোঁড়াখুঁড়ি করে পানির লাইন বসিয়েছে।৯০ নম্বর সড়কে ডিএনসিসির ৩ নম্বর আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঠিক সামনের সড়কেই ওয়াসার খোঁড়া অংশ বেহাল অবস্থায় পতিত রয়েছে। ব্যস্ততম ৮৭ ও ৮৮ নম্বর সড়কজুড়ে বিরাট বিরাট গর্ত। গুলশান-১-এর ৯, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর রাস্তাটি খানাখন্দে ভরা। বনানী আবাসিক এলাকার ১০ ও ১১ নম্বর সড়কসহ পাশের প্রতিটি সড়কে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ির চিহ্ন। কূটনৈতিকদের বসবাসের জন্য রাজউক নির্মিত বারিধারা আবাসিক এলাকার দুটি প্রধান সড়ক এবং ১২টি শাখা সড়কের অবস্থাও বেহাল। এসব সড়কের কোথাও গর্ত, কোথাও জলাবদ্ধতা রয়েছে। এসব ব্যাপারে ডিএনসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহমেদ আলী শাহ্ জানান, ডিএনসিসির নিজস্ব অর্থে গুলশান, বনানী ও বারিধারায় রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে। অচিরেই রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থার উন্নতি হবে।

Share.

Leave A Reply