লাকসামের গৌরব নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী

0

মোঃ সাইফুল আনোয়ার: উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে মুসলমান সমাজ কিছুটা সচেতন এবং নিজেদের অবস্থার উন্নয়নে সচেষ্ট হয়ে উঠে। ইংরেজ সরকার কর্তৃক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিপীড়নের ফলেই মুসলমানরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থেকেছে। ফলে তাদের মধ্যে এমন সব কুসংস্কার এসে বাসা বেঁধেছে যা তৎকালীন নারী সমাজের সর্বাধিক দুঃখের ও কষ্টের কারন হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে মুসলমান সমাজ কিছুটা সচেতন এবং নিজেদের অবস্থার উন্নয়নে সচেষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। সমাজ পরিবর্তনের এ দায়িত্ব যারা হতে তুলে নিয়েছিলেন ফয়জুন্নেসা তাদেরই একজন। শিক্ষা, দীক্ষায়, কর্মে ও সম্পদে বাঙালি জাতি উন্নত হবে। প্রতিষ্ঠিত করে নিবে বিশ্বের বুকে আপন মর্যাদার আসন, এটাই ছিল তাঁর আজীবন সাধনা। উনবিংশ শতকের চতুর্থ দশকে পূর্ব বাংলার এক নির্ভৃত পল্লীতে জন্মগ্রহন করে যে নারী অমর অবদান রেখে গেছেন তা চিরদিন ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
১৮৩৪ সালে কুমিল্লা জেলার হোসনাবাদ পরগনায় লাকসামের অনতিদূরে পশ্চিমগাঁয়ে বিদ্যোৎসাহী, সমাজসেবী ও সাহিত্যব্রতী জমিদার নবাব ফয়জুন্নেসার জন্ম। তিনি ছিলেন পিতা আহমদ আলী চৌধুরী ও মাতা আরফুন্নেছার তৃতীয় সন্তান। বড় দুই ভাই ইয়াকুব আলী ও ইউসুফ আলীর পরে তার জন্ম হয়। ফয়জুন্নেসার পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনিই জমিদারী পরিচালনার প্রশিক্ষন পেয়েছেন। পিতামাতার অতি আদরের ফয়জুন। মির্জা আগোয়ান খাঁর অধঃস্তন ষষ্ঠ বংশধর আহমদ আলী চৌধুরীর কন্যা ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী।
গৃহেই ফয়জুন্নেসার লেখাপড়া শুরু হয়। তাঁর গৃহশিক্ষক ছিলেন তাজউদ্দিন। সে সময়ের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মৌখিক ভাষা ছিল উর্দু অথচ তিনি জ্ঞান অর্জন করেছেন বাংলা মাধ্যমে। জ্ঞান চর্চার অদম্য স্পৃহায় কঠিন পর্দাপ্রথার অন্তরালে থেকেই তিনি বাংলা, আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত চারটি ভাষাতেই ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তাঁর জ্ঞান-সাধনা ছিল অবিরাম। জ্ঞান চর্চা আরো গভীর হয় স্বামী সঙ্গ বঞ্চিত ও ভাগ্য বিড়ম্বিত জীবনে। কত কঠোর সাধনায় বিভিন্ন ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করা যায় তা সহজেই অনুমেয়। অথচ বাড়িতে ছিল না তেমন কোন শিক্ষণীয় পরিবেশ, ছিল না কেউ প্রেরনাদানের। প্রেরণার উৎস ছিল নিজের মধ্যে। তিনি যে ভাবুক প্রকৃতির স্বাপ্নিক ছিলেন তার নমুনা তাঁর ‘রূপজালাল’ নামক গ্রন্থখানি। কিশোরী ফয়জুনের বিয়ের প্রস্তাব আসে মোহাম্মদ গাজী চৌধুরীর পক্ষ থেকে। তিনি ছিলেন ফয়জুনের পিতার দূসম্পর্কিত ভাগিনা। মাতৃহারা এ ভাগিনার ছোটবেলা থেকেই এ বাড়িতে আসা যাওয়া ছিল। কিশোরী অর্থাৎ কম বয়স বলে এ বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়া হয়। ফয়জুন্নেসা এ বিষয়ে তার লিখিত রূপজালাল গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী আমাদের আত্মীয় এক মহামান্য ভূ-স্বামীর সন্তান।. . . . মাতৃ-পিতৃহীন হওয়াতে পিতা তাহাকে অত্যন্ত ¯েœহ করতেন। আমাদের আলয়ে তাঁহার সর্বদা গমনাগমন ছিল। এক দিবস আমাকে দর্শন করিয়া তাঁহার চিত্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল। কিন্তু নাবালিকা বিধায় আমার পিতা-মাতা এ বিষয়ে অসম্মতি জানান। তাতে তরুন প্রেমিক গাজী, ভাবাবেগে সংসারের প্রতি অনাসক্ত হয়ে উদসীনভাবে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। অনেক চেষ্টার পর আত্মীয়-স্বজন তাকে বিয়ে করতে সম্মত করান। ‘মন্ত্রিগনের মন্ত্রণানুযায়ী ত্রিপুরার প্রধান বিচারালয়ের উকিল সরাইল নিবাসী নাদেরুজ্জামান মুন্সির নন্দিনীর পাণি গ্রহন করিলেন।’ কিন্তু তার অন্তরতলে অনুক্ষন আমার (ফয়জুন্নেছার) নাম জপ করিতেন। স্ত্রীর নাম ছিল নজমুন্নেসা। যতদূর জানা যায় তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। ‘বিধির লীলা বুঝা দুঃসাধ্য। কিসে যে কি ঘটিল কে বলিতে পারে।’ বিপর্যেয়ের পর বিপর্যয় এসে ফয়জুন্নেছার পরিবারকে বিব্রত করে ফেলল। পিতার মৃত্যু, মায়ের অসহায়তা, গাজী চৌধুরীর লোককের দৌত্যকার্য সব মিলে ঘটনা প্রবাহের মোড় ফিরিয়ে দিল। সুতরাং মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী আবার ফয়জুনকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দিতে থাকেন। অনেকটা বাধ্য হয়ে ফয়জুন্নেছার মা বিবাহে সম্মতি দিলেন। তবে শর্ত ছিল- ‘ফয়জুন্নেছা সতীনের সঙ্গে একত্রে বাস করতে ভাউকসার যাবেন না। পশ্চিমগাঁয়েই থাকবেন। গাজী চৌধুরীর কাছে তখন ফয়জুন্নেছাকে পাওয়াই ছিল বড় কাজ, তাই তিনি উক্ত শর্তেই রাজি হয়ে যান। তবে এ বিয়েতে গাজী চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা যায়। বিয়ের পর ফয়জুন্নেছা মায়ের কাছেই থেকে গেলেন। কয়েক বছর বেশ সুখেই কাটে। এর মাঝে আরশাদুন্নেছা ও বদরুন্নেছা নামে দুইকন্যা সন্তানও জন্ম নেয়। ইতোমধ্যে এক সময়ে গাজীর মনে ফয়জুন্নেসাকে নিজ বাড়িতে নেওয়ার অভিলাষ জন্মে। কিন্তু সরাসরি প্রস্তাবে না গিয়ে দুষ্টবুদ্ধির প্রণোদিত হয়ে অপকৌশল অবলম্বন করেন। কোন এক জোসনা রাতে গাজীর বজরা করে নদীতে ঘুরে আসার প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হন ফয়জুন্নেছা। রাত বেড়ে যাচ্ছে এবার ফেরা যাক। ফয়জুন্নেসার বারবার তাগাদা সত্ত্বেও গাজীর ইশারায় বজরা এসে ভিড়ে ভাউকসার জমিদার বাড়ির ঘাটে। গাজী বিনয়াবনত কন্ঠে ফয়জুন্নেসাকে বজরা থেকে নেমে বাড়িটি এক নজর দেখার অনুরোধ করে। এদিকে বাড়ির অভ্যন্তরে তখন চলছে অভ্যর্থনার ঘটা। ফয়জুন্নেছার কাছে স্বামীর চাতুরী স্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনি বজরা থেকে নামতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু গাজী ফয়জুন্নেসাকে নামতে বাধ্য করেন। চরম অসন্তোষের সঙ্গে ফয়জুন্নেসা বাধ্য হয়ে গাজীর বাড়িতে প্রবেশ করেন। স্বামীর বাড়িতে সাতদিন অবস্থান করলেও এ সাতদিন স্বামীর বাড়ির কোন কিছু স্পর্শ করেন নি। খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে খাওয়ার পানি, গোসলের, এমনকি অজুর পানি পর্যন্ত পশ্চিমগাঁও থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। সাতদিন পর স্বেচ্ছায় চলে আসার উদ্যোগ নের ফয়জুন্নেসা। বজরাও প্রস্তুত হয়। সেই মুহুর্তে গাজীর কাছ থেকে তিনি শোনেন এক নিষ্ঠুর প্রস্তাব। ফয়জুন থাকুক বা না থাকুক তাতে গাজী চৌধুরীর আপত্তি নেই, তবে গাজীর এক সন্তান তাঁর বাড়িতেই থাকবে।
স্বামীর বাড়িতে ফয়জুন্নেছার পদার্পন যেমন তিক্ততার মধ্য দিয়ে, এর অবসানও হলো তার চেয়ে অধিক ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে- প্রথমা কন্যার সঙ্গে বিচ্ছেদ এবং এক কঠোর পণ ‘দুজনে দুজনের মুখ জীবনেও দেখবেন না’ এবং মোহাম্মদ গাজী তাঁর বাকি জীবনের একটি দিনের জন্যও আর ফয়জুন্নেসাকে দেখতে আসেন নি।
এরপর মূলত ফয়জুন্নেসার সংসার জীবনের অমানসিক যন্ত্রণাকে চেপে রাখতেই তিনি সাহিত্য চর্চা করেন। জমিদারী পরিচালনার পাশাপাশি তিনি সাহিত্য চর্চা করেই জীবন কাটিয়েছিলেন। সারাজীবনে তিনি আর স্বামীর বাড়ি ভাউকসার যাননি। উদ্ঘাটিত হয় এক নতুন জীবন সংগ্রামের, সাধনার, দায়িত্বের। ১৮৮৫ সালে মাতৃ বিয়োগের পূর্বেই ফয়জুন্নেসার উপর বর্তায় জমিদারী দেখাশোনার ভার। এও তার জন্য এক নতুন পরীক্ষা। বিদ্যাবত্তায়, বুদ্ধির দীপ্ততায়, বিচক্ষণতায় ও কর্ম দক্ষতায় তিনি ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে সবার উপরে। তাইতো তার উপর জমিদারীর গুরুভার। জমিদারীর কঠোর দায়িত্ব তিনি আজীবন মোড়ায় বসে এবং চটি জুতা পায়ে দিয়ে এক সুযোগ্য শাসকরূপে ন্যায় নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। অথচ অন্তর রাজ্যে ছিল অশান্ত ঝড়। ব্যর্থ নারী জীবনের অসহনীয় যন্ত্রনা। কিন্তু বাইরে ছিল তার স্বাভাবিক কর্মজীবন। ফয়জুন্নেসা বিরাট জমিদারীর অধিকারী ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ফয়জুন্নেসা রুটিনমাফিক দৈনন্দিন জীবন যাপন করেছেন। যারা বড় হয়, তাদের একটা স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য থাকে। সময়ানুবর্তিতা ও নিয়ম নিষ্ঠা ছিল তার জীবনের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। শীত-গ্রীষ্মকাল নির্বিশেষে এবাদত বন্দেগী ও কর্মরীতি ছিল নি¤œরূপ। প্রতিদিন শেষরাতে উঠে অজু করে যথারীতি জায়নামাজে বসতেন। প্রথমে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। নামাযান্তে কুরআন তেলাওয়াত করতেন ফজরের ওয়াক্ত পর্যন্ত। ফজরের নামাজ শেষ করে তিনি আবার বসতেন কুরআন তেলাওয়াতে।
বেলা আটটা নাগাদ কুরআন তেলাওয়াত শেষ করে সামান্য নাস্তা গ্রহন করতেন। এরপর বসতেন জমিদারীর দপ্তরে। জমিদারী কাজ শেষ হওয়ার পরে সামান্য বিশ্রামের পর গোসলের সময় অন্দরের দেয়ালবেষ্টিত পুকুরে নিয়মিত সাঁতার কাটতেন। খানাপিনা শেষ করে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিতেন। জোহরের নামায শেষে আবার বসতেন জমিদারীর কাজ নিয়ে। আসরের নামায শেষে বসতেন ফয়জুন্নেসা পুস্তকালয়ে। বাকি সময়টা কাটাতেন এবাদত, পারিবারিক কাজ এবং অধ্যয়ন করে। সময়টা ছিল হিন্দু পুনর্জাগরণের যুগ। এ সময় বাংলার মুসলমানদের জীবনে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার। ইংরেজি শেখা হারাম, মাওলানাদের এ রকম ফতোয়ার কারনেই মুসলমানরা অধিক পেছনে পড়ে যায়। যুগ ও যুগের গতিকে অস্বীকার করে নিজেদের তারা দিশেহারা করে তুলেছিল। আধুনিক ও পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষাকে বর্জন করে নিজেদের দুর্ভোগের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলো মুসলিম সমাজ। অন্যদিকে ফয়জুন্নেসা বেশ ভালভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন যে জাতির উন্নতির জন্য আধুনিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। আর জ্ঞান অর্জন করা তো ছিল সবার জন্য ফরয। এক্ষেত্রে আল্লাহ নারী-পুরুষ কারো জন্য আলাদা করে ফরয করেননি। তাই নারী-পুরুষ তথা গোটা সমাজকে শিক্ষিত করার জন্য তিনি তিন শ্রেনীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। পশ্চিমগাঁও এর নিজ বাড়িতে মসজিদে দীনিয়াত, ধর্মীয় শিক্ষা দানের জন্যে স্থাপন করেন একটি অবৈতনিক মাদরাসা যা পরে উন্নীত হয় নিউস্কীম মাদরাসায়। আরো পরে উচ্চ মাধ্যমিক ইসলামিক কলেজ। যা বর্তমানে নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজ নামে পরিচিত। নিজ গ্রামেই ১৯০১ সালে কন্যা বদরুন্নেসার নামে স্থাপন করেন মধ্য ইংরেজি স্কুল। পরে তা হাইস্কুলে উন্নীত হয়। নিজ গ্রামে স্থাপন করেন একটি প্রথমিক বিদ্যালয়। এছাড়া ১১টি কাচারির প্রত্যেকটির কাছে নিজ জায়গায় নিজ ব্যয়ে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। কুমিল্লা শহরের নানুয়া দীঘির পাড়েও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। নাম ফয়জুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়। সেটি কালের আবর্তে নিজ নাম হারিয়ে বর্তমানে শৈলরানী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাথমিক বিভাগরূপে পরিচালিত হচ্ছে। ১৮৭৩ সালে তদানীন্তন মুসলিম নারী শিক্ষার প্রতি বিরূপ পোষণ করলেও ফয়জুন্নেসা সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে কুমিল্লার বুকে সর্বপ্রথম একটি উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলটির নাম ফয়জুন্নেসা উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়। মুসলমান মেয়েদের শিক্ষায় উৎসাহিত করার জন্যে তিনি জমিদারী আয় থেকে তাদের জন্য মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থাও করেন। যে যুগের মুসলমান ছেলেরাই ইংরেজি শিক্ষার জন্যে তিনি যে আলো জ্বালালেন তা নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিকতার কাজ। যে সময়ে মুসলমান আলেম সমাজ নারী শিক্ষার ঘোর বিরোধী, মুসলমান শিক্ষিত সমাজ তথা নেতাগন নিজেদের সমস্যা নিয়েই ব্যস্ত, নারী শিক্ষার ব্যাপারে তেমন কিছু ভাবছেন না, সামান্য যা আলোচনা, সমালোচনা তার সবই পশ্চিমবঙ্গ তথা কোলকাতায়- সে সময়ই নবাব ফয়জুন্নেসা পূর্ববঙ্গে স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন শুধু পুরুষের জন্য নয়, নারীর জন্যও। কলকাতায় বেথুন বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাত্র ২৪ বছর পরে এং লর্ড ডালহৌসীর নারী শিক্ষার স্বপক্ষে ১৮৫০ সালে নির্দেশ দানের মাত্র ২৩ বছর পরে, বর্তমান যুগের দিকপাঞ্জেরী বেগম রোকেয়ার জন্মের সাত বছর পূর্বে এবং ১৯১১ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মোমোরিয়াল প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৯৩১ সালে হাই স্কুলে উন্নীত হওয়ার ৫৮ বছর পূর্বে, নবাব ফয়জুন্নেসা কুমিল্লার বুকে পর্দানশীল মেয়েদের জন্য উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এক দুর্জয় দুঃসাহসিকতার পরিচয় দান করেছেন। নওয়াব আব্দুল লতিফ আর সৈয়দ আহমদ যখন ভেবেছেন তরুন মুসলমান ছাত্রদের পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষার কথা, তখনই ফয়জুন্নেসা মেয়েদের ইংরেজি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন। একই বছর ১৮৭৩ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে মুসলমান ছেলেদের উচ্চ শিক্ষার পথও উন্মুক্ত হয়। ফয়জুন্নেসার লক্ষ্য ছেলে ও মেয়েদের সমভাবে শিক্ষা দান। নারী জাগরনের অগ্রদূত নামে অভিহিত প্রভাবশালী দুই নেতার চেয়ে ফয়জুন্নেসার দূরদৃষ্টি ছিল অধিক প্রসারী। যুগ গতির সঙ্গে চলার পথের দিশারিণী ছিলেন তিনি। তিনি অনুধাবন করেছিলেন শিক্ষা ছাড়া এ জাতির কোন উপায় নেই এবং তা প্রয়োজন নারী-পুরুষ উভয়ের। প্রজা সাধারনের অবস্থা স্ব-চক্ষে দেখার জন্য প্রায়ই তিনি পালকিতে চড়ে বিভিন্ন মৌজা পরিদর্শনে বের হতেন। জমিদার হিসাবে ফয়জুন্নেসা ছিলেন প্রজারঞ্জক, জনকল্যাণকামী। দেওয়ান লকিয়তউল্লাহ ছিলেন তাঁর দক্ষিন হস্ত। প্রবীণ সুদক্ষ নায়েব সাহেব অত্যন্ত বিশ্বস্ততা ও বিক্ষনতার সাথে তাঁকে সাহায্য করেন। ফয়জুন্নেসা পর্দার আড়ালে থেকেই সব কাজকর্ম চালিয়েছেন। গরীব দুঃখীদের পানির কষ্ট দূর করার জন্যে পুকুর দীঘি খনন করান। রাস্তাঘাট তৈরি করেন আর মক্তব মাদরাসা স্থাপনে সাহায্য করেন। ফয়জুন্নেসার অমর কীর্তি বাংলা ১২৯৮ বাঙ্গাব্দের ৩ শে জ্যৈষ্ঠ (১৮৯২ ইং) সম্পাদিত ওয়াকফনামা, যাতে তিনি তার এক লক্ষ টাকার বাৎসরিক আয়ের জমিদারির বিরাট একটা অংশ অর্থাৎ ষাট হাজার টাকার বাৎসরিক আয়ের জমিদারির বিরাট একটা অংশ আল্লাহর নামে মানব সেবায় দান করে দিয়েছেন। জ্ঞানের আলোয় যার প্রান আলোকিত সর্বত্র তিনি আলো বিলিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। কোন ভৌগলিক সীমারেখায় তা আটকে থাকে না। হজ্বে গিয়ে ফয়জুন্নেসা মক্কা শরীফে একটা মুসাফিরখানা ও একটা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া তথাকার মাদরাসা-ই-সওলাতিয়া ও একটা মাদরাসা পতিষ্ঠা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার উত্তরাধিকারগন এ সমস্ত অর্থ নিয়মিত পাঠাতেন। জানা যায় যে- তিনি নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরেও একটি স্কুল স্থাপন করেন। স্বর্ণকুমারী দেবীর নারী কল্যাণ প্রতিষ্ঠানেও তিনি কয়েক হাজার টাকা দান করেছেন। মানবতার সেবায় ফয়জুন্নেসার সর্বোৎকৃষ্ট অবদান হলো কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা জানানা (মহিলা) হাসপাতাল। শুধুমাত্র নারীদের চিকিৎসার জন্য ১৮৯৩ সালে কুমিল্লা শহরের দক্ষিন চর্থায় তৎকালীন এক দুস্থ পল্লীতে ফয়জুন্নেসা হাসপাতালটি স্থাপন করেন। হাসপাতলে ইংরেজ ডাক্তার এবং দেশী খ্রিস্টান নার্সদের সমাবেশ ঘটেছিল। ১৮৯৩ সালেই কুমিল্লায় ‘বেঙ্গল ব্রাঞ্চ-কাউন্টারস অব ডাফরিন ফান্ড কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি মহিলাদের চিকিৎসা কর্মসূচিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। ফয়জুন্নেসা তখন তাঁর হাসপাতাল চিকিৎসা ব্যবস্থায় উন্নতমান রক্ষিত হবে ভেবে হাসপাতালটি উক্ত কমিটির হাতে ন্যস্ত করেন। উক্ত কমিটির তত্ত্বাবধানেই হাসপাতালটি সে স্থানে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত পরিচালিত হয়। সে সময়ে অর্থাৎ ১৯২৯ সালেই কুমিল্লার সদর হাসপাতালটি যা বহুকাল যাবত গোমতি নদীর পাড়ে গোয়াল পট্টীর উত্তরে অবস্থিত ছিল তা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে দক্ষিন চর্থায় স্থানান্তরিত হয়। চিকিৎসার সুবিধার্থে তখন ফয়জুন্নেসা জানানা হাসপাতালটিও সদর হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব ওঠে যা এক রেজিস্ট্রীকৃত দলিলে ১০/০৭/১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদলব্ধ অর্থে নির্মিত সদর হাসপাতালের পূর্বাংশে অবস্থিত দেয়াল ঘেরা দ্বিতল দালানটিতে ফয়জুন্নেসা জানানা হাসপাতালটি বর্তমানে নবান ফয়জুন্নেসা ফিমেল ওয়ার্ড নামে পরিচিত। পশ্চিমগাঁয়ে গোমতী নদীর অদূরে বাড়ির প্রঙ্গনে স্থাপিত দশ গম্বুজের সুদৃশ্র মসজিদটি তাঁর ধর্ম-প্রবনতার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। জমিদারি এলাকার বিভিন্ন স্থানে মসজিদ নির্মানেও তার সহযোগিতা ছিল। তৎকালীন ত্রিপুরার (বর্তমান কুমিল্লা) জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন মিষ্টার ডগলাস। জনদরদী এই বিদেশি প্রশাসক জেলার উন্নতির জন্যে একটি ব্যয়বহুল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজে হাত দেন। এ কাজে প্রয়োজনীয় অর্থের সংকুলান না থাকায় তিনি এ অঞ্চলের সকল অর্থশালী জমিদারের কাছে অর্থ ঋন চেয়ে চিঠি পাঠালেন। কিন্তু বিরাট অংকের অর্থ হাতছাড়া করতে কেউই রাজি হল না। মিষ্টার ডাগলাস বিপদে পড়লেন। অর্থের অভাবে পরিকল্পনা পরিত্যাগ করবেন মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। এমনি সময় হোমনাবাদ পরগনার (বর্তমান লাকসাম থানার পশ্চিমগাঁও) জমিদারের একজন দূত এসে হাজির হলেন তাঁর দপ্তরে। দূত জানালেন চিঠি মারফত যে টাকা চাওয়া হয়েছে তার সবটাই হোমনাবাদ পরগণার জমিদার পাঠিয়েছেন। তবে বেগম সাহেবা বলেছেন,“জনগনের উপকার হবে বিবেচনা করে সম্পূর্ণ টাকাটা তিনি ঋন হিসেবে নয়, দান হিসেবেই দিয়েছেন। অবাক হলেন মিস্টার ডগলাস। বড় বড় জমিদার, ধনী ব্যবসায়ী কারো কাছ থেকেই যখন কোন সাড়া পাওয়া যায়নি, সেই মুহুর্তে এই মহিলা জমিদারের মহানুভবতা ও দানশীলতা তাঁকে অভিভূত করল। তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, এ মহীয়সী নারীর দানশীলতা, প্রজাহৈতষী, ন্যায়পরায়নতা, শিক্ষায় অবদান এবং সাহিত্য সাধনার কথা। বিষয়টি তিনি বৃটিশ রানী ভিক্টোরিয়ার গোচরে আনলেন। রাণী ভিক্টোরিয়া খুশি হয়ে সরকারিভাবে এ মহিলা জমিদারকে ‘বেগম’ উপাধিতে ভূষিত করতে নির্দেশ দিলেন। রাণী ভিক্টোরিয়ার প্রস্তাব তিনি সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, মহিলা জমিদার হিসেবে এমনিতেই তিনি ‘বেগম’ বলে পরিচিত। রাণী ভিক্টোরিয়ার রাজদরবারে পুনরায় পরামর্শ করে ফয়জুন্নেসাকে ‘নবাব’ উপাধিতে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৮৯ সালে বৃটিশ রাণী ভিক্টোরিয়া কর্তৃক ‘নবাব’ উপাধিতে ভূষিত হয়ে বিশ্বব্যাপী ইতিহাস সৃষ্টি করলেন হোমনাবাদ পরগনার জমিদার নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী। আরো জানা যায়- ‘পর্দানশীল ফয়জুন্নেসা নাকি মহারাণী ভিক্টোরিয়ার (১৮১৯-১৯০১) ব্যক্তিগত অনুরোধক্রমে একটি ফটোগ্রাফ দিয়েছিলেন। সেটি মহামান্য রাণীর আদেশক্রমে বার্কিংহাম প্রাসাদে রক্ষিত হয়েছিল বলে জনশ্রুতি আছে। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে বলছি, নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হোমনাবাদে তথা আজকের পশ্চিমগাঁয়ের গাজী শাহেদা এবং রাজকর্মকর্তা আগন খাঁ এর পরবর্তী বংশধর। এই মহীয়সী নারীর পুরো জীবনী জানলে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের অন্তর কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, ভালবাসায় পরিপূর্ন হয়ে উঠবে। পাঠ্যপুস্তুকে এই নারীর জীবনী সংযোজন করা উচিৎ যাতে নবপ্রজন্ম লোভ ও মোহ ত্যাগ করে মানব কল্যানমুখী হতে পারে। বছর আসে বছর যায়। কিন্তু নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতীয়ভাবে তেমন কোন কর্মসূচি পালনের খবর আমরা শুনতে পাইনা। এটা অবশ্যই কষ্টের। অথচ বেগম রোকেয়ার জম্মের পূর্বে যিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সমাজের সর্বস্তরে অবদান রেখে গেছেন তিনি আজ উপেক্ষিত। জাতীয়ভাবে তার স্বীকৃতি অর্জন না হওয়া আমাদের জন্য চরম ব্যর্থতা। এ জন্য কুমিল্লার জনপ্রতিনিধিদের আন্তকিরতা জরুরী। জাতীয়ভাবে দেশব্যাপী তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিবস স্মরণ ও আলোচনা সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা উচিৎ।
আমি কৃতজ্ঞ সময়ের দর্পণ’র নির্বাহী সম্পাদক ফারুক আল শারাহ্ এর প্রতি যিনি আমাকে নবাব ফয়জুন্নেসার কথা লেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। এ মহীয়সী নারী ১৯০৩ সালের অক্টোবর মাসে ১৩১০ বাংলা ২০ আশ্বিন ইন্তেকাল করেন।

Share.

Leave A Reply