শত কোটি টাকার দুর্নীতিতে জড়িত স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিম

0

সরকারী হাসপাতালগুলোতে কী কী যন্ত্রপাতি লাগবে, তার তালিকা করে দিচ্ছে ঠিকাদার। আশ্চর্য হচ্ছেন? আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এই দেশে সবই সম্ভব! শুধু কি তাই! সেই ঠিকাদারকে সাহায্য করতে তদবির যাচ্ছে আবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিমের দফতর থেকে। যন্ত্রপাতির দাম ধরা হচ্ছে বাজার মূল্য থেকে অনেক বেশী। এরকম ভায়াবহ চিত্র ধরা পড়েছে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। যা সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে।

মনোয়ার উল আজিজ ছিলেন পাবনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক। সবার কাছে জনপ্রিয় ও ভালো প্রশাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। হাসপাতালটির সেবার কার্যক্রম এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। যার মাধ্যমে পাবনা জেনালের হাসপাতাল জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হাসপাতালের পুরষ্কার লাভ করে। তারপরেও ডা. মনোয়ার উল আজীজকে হাসপাতালটিকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে। কারণ তাকে ওএসডি করা হয়েছে। অবসরে যাওয়ার মাত্র ১৫ দিন আগে প্রচলিত আইন ভঙ্গ করে তাকে বদলী করা হয়।

কিন্তু কেন? ডা. মনোয়ার বলেন, আমি বুঝতে পারছি না, কেন আমাকে বদলী করা হচ্ছে, আমার অবসরে যাওয়ার সময় অতি সন্নিকটে। আমার কোনো ত্রুটি না থাকলে তো বদলী করার কথা না। আমি জানি না উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমার কোনো ত্রুটি পেয়েছে কি-না। ত্রুটি থাকলে তো আমার নিকট কারণ দর্শানোর নোটিশ আসতো। হঠাৎ করে বদলী করার কোনো কারণই খোঁজে পাচ্ছি না। তবে আমার সন্দেহ হচ্ছে, এক কন্ট্রাক্টর জাতীয় এক লোক এসে আমাকে একটি তালিকা ধরিয়ে দিল। এবং আমাকে বললো, আমি যেন এই তালিকা অনুযায়ী পাবনা হাসপাতালের জন্য চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে সাবমিট করি। তালিকার যন্ত্রপাতির সব তো আর প্রয়োজন নেই। তাই তার সঙ্গে আমার একটু মতনৈক্য হয়। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, এটাই হয়তো আমার ত্রুটি। তবে এ বিষয়ে আমি নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারবো না।

কে এই কন্ট্রাক্টর?

মোহাম্মদ লুৎফুল আলম। যিনি ব্যাঙ্গল সায়েন্টিফিক অব সার্জিক্যালের সহকারী ম্যানেজার। এই ব্যক্তিটিই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির একটি তালিকা নিয়ে ডা. আনোয়ার উল আজিজের সঙ্গে দেখা করতে যান। তালিকাটিতে সিটিস্ক্যান থেকে এনেসথেসিয়া কোনো কিছুই বাদ যায় নি। যার সম্ভব্য দাম ধরা হয়েছে ১২৭ কোটি টাকা। যা প্রকৃত দাম থেকে কয়েকগুণ বেশী। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি তালিকাটি হাসপাতালের নয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের তৈরী করা। হাসপাতালের তত্ববাধয়াককে চাপ দেন চাহিদাপত্রটি স্বাক্ষর করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিতে। তারাই এই মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন করিয়ে নিবেন।

ডা. মনোয়ার উল আজিজ বলেন, তালিকার সব তো এই মূহুর্তে প্রয়োজন নেই। তাই আমি তালিকাটি মন্ত্রণালয়ে পাঠাই নাই। আমি তাকে (লুতফুল আলম)কে না করে দিয়েছি। আমি জানি না এটা আমার কত বড় অপরাধ। আমি তো সরকারি আইনের বাহিরে যেতে পারি না।

ব্যাঙ্গল সায়েন্টিফিক অব সার্জিক্যালের কর্ণধার জাহের উদ্দিন সরকার বলেন, আমরা ঢাকা মেডিক্যাল, হৃদরোগ হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল সহ দেশের বহু হাসপাতালে আমরা মেডিক্যাল ইকুয়িপম্যান্ট সরবরাহ করে থাকি। তাকে প্রশ্ন করা হয়, পাবনা হাসপাতালে আপনার যন্ত্রপাতির চাহিদাপত্র কোন আইন বা অধিকারের বলে তৈরী করেছেন এবং তার পাবনা হাসপাতালে পাঠিয়েছেন? এই প্রশ্ন শুনে তিনি চমকে উঠেন, তিনি সরাসরি বিষয়টি নাকচ করে দেন। পাবনা হাসপাতলের চাহিদাপত্রের মত পটুয়াখালী হাসপাতালেও একটি চাহিদাপত্র তারই টেবিলে পড়ে ছিল। চাহিদাপত্রটির দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তাহের উদ্দিন দ্রুত কাগজটি ছিড়ে ফেলে। ডাসবিন খোঁজে আরো অনেক চাহিদাপাত্র পাওয়া যায়, যেখানে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির সন্ধার পাওয়া যায়। এভাবেই প্রভাব খাটিয়ে দেেেশর বিভিন্ন হাসপাতলের চাহিদাপত্র তৈরী করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির ক্ষমতার উৎস কোথায়?

এর উৎস জানতে হলে ফিরে যেতে হবে পাবনায়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিমের এপিএস মোশাররফ ডা. মনোয়ার উল আজিজকে ফোন করে জানান, লুতফুল আলম নামে এক ব্যক্তি চাহিদাপত্র নিয়ে যাবেন তার কাছে। এব্যপারে প্রশ্ন করা হলে, প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জাহের সরকার বলেন, এ ব্যপার আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না। তাকে আবার প্রশ্ন করা হয়, কেন আপনি বলতে চাচ্ছেন না। তখন উত্তরে তিনি বলেন, এ ব্যপারে আমাকে প্রশ্ন করা হলে আপনার কোনো লাভ হবে না। আপনি কি স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিমের এপিএস মোশাররফকে চিনেন? তার সাথে আমার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। ঠিকাদারটির চাহিদা পত্র দিয়ে যাওয়ার পরপরই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এপিএস পাবনা জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ককে বারবার চাপ দেন, তিনি যেন চাহিদাপত্রটি স্বাক্ষর করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন এবং অনুমোদনের আশ্বাসও দেন। অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের যেসব হাসপাতালেই তিনি পরিদর্শনে যান, তার পরপরই উক্ত প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের তৈরী করা চাহিদাপত্র পাঠিয়ে দেয় ঐসব হাসপাতালে। জাহের উদ্দিনের প্রতিষ্ঠানটি এসব ভূয়া চাহিদাপত্র দিয়ে এ পর্যন্ত ২০টি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে। দেশের বহু হাসপাতালের যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত বহু উন্নয়নের কাজ চলছে। সূত্র বলছে, মন্ত্রীর পছন্দের ঠিকাদরারই এসব কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে।

মন্ত্রীর নিজ জেলা সিরাজগঞ্জের হাসপাতালের অনেক উন্নয়ন কাজ চলছে। সেখানকার সিভিল সার্জন কার্জালয়ে চলছে লোকোচুরি খেলা। জানা যাচ্ছে না কত শত কোটি টাকার কাজ চলছে সেখানে। একটি সূত্র জানায়, বাজার মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশী মূল্যে যন্ত্রপাতি কেনার বন্দবস্ত প্রায় চূড়ান্ত। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের নিয়মিত বরাদ্ধের বাইরেও আরো ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্ধ রাখা হয়। জানা যায়, এই টাকা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সুপারিশে ব্যয় করা হয়। এই টাকার বেশীর ভাগই খরচ করা হয় যন্ত্রপাতি কেনার কাজে। এই টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য প্রভাবশালী একটি চক্র বেশ সক্রিয়।

ঔষধ কেনায়ও চলছে দুর্নীতির মহোউৎসব!

যন্ত্রপাতি কেনার সঙ্গে ঔষধ কেনায়ও চলছে দুর্নীতি। পাবনা জেলার এফবিসিসিআই এর সিনিয়র সভাপতি এবং পাবনা জেলার ঔষধ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মাহবুব উল আলম। এই পরিচয়ের চেয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর শ্যালক। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিমের শশুরবাড়ী পাবনায়। উক্ত মাহবুব উল আলমের দাপটে অস্থীর পাবনা সিভিল সার্জন কার্যালয়। ২ কোটি টাকার ্ঔষধের চাহিদাপত্র দিতে অনবরত চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। শুধু তাই না, তিনি তা বিনা টেন্ডারে সরবরাহ করতে চান।

কে এই মীর মোশাররফ?

দুর্নীতির প্রধান ও মূল কারিগর হচ্ছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিমের এপিএস মীর মোশাররফ হোসেন। যার বাড়ি হচ্ছে সিরাজগঞ্জে। উক্ত মোশাররফ দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগের বার অর্থাৎ ৯৬ সালেও নাসিমের এপিএস ছিলেন মোশাররফ। উক্ত মোশাররফ ঠিকাদরদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে হাসপাতালগুলোতে প্রভাব খাটান। মোশাররফের সঙ্গে অনেক চেষ্টা করে মোবাইলে যোগযোগ করা হয়, তিনি বলেন, আমি গতকাল হজ করে আসছি, তাই এব্যপারে কিছু বলতে চাই না। জহিরের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিমকে এসব দুর্নীতির ব্যপারে প্রশ্ন করা হলে, তিনি এসব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান।

একজন ব্যক্তির কারণে পাবনায় থেমে যায় এই দুর্নীতি চক্রের দুর্নীতি। ফলশ্রুতিতে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে সৎ, কর্মট ও সাদামনের মানুষ ড. মনোয়ার উল আজিজকে। শুধু তিনিই নয়, তার সঙ্গে তার স্ত্রী ডা. তাহসিন বেগমকেও ওএসডি করা হয়। তাদের বিদায়ে পাবনা জেনারেল হাসপাতাল আজ কন্দনরত।

পৃথিবীতে শুধু খারাপ, নষ্ট-ভ্রষ্ট, লোভী, দূর্নীতিবাজ, অসৎ এবং দুষ্ট লোকের সংখ্যাই বেশী। কিন্তু এর বিপরীতেও অনেক ভালো, সৎ ও সাদা মনের মানুষও রয়েছে। কোন কবি যেন বলেছিলেন, “এমনো জীবন তুমি করিবে গঠন, মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন” কিন্তু কিছু মানুষ আছে, যারা চাঁদ কপাল নিয়ে জন্মায়, যাদের জন্য মানুষ জীবিতকালেই কাঁদে! সেই ব্যক্তিটি আর কেউ নয়, তিনি হলেন ড. মনোয়ার উল আজিজ।
সূত্র: বিডিটুডে

Share.

Leave A Reply