সাইন্স ফিকশন: ম্যাগনোলিয়া

0

আমাজন, সৌন্দর্যের সূতিকাগার বিশ্বের বৃহত্তম প্রাচীন বৃষ্টিবন। অদ্ভুত সুন্দর সব প্রাণীদের বাস দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় ১.৭ বিলিয়ন একর আয়তনের এই বনে আর নদীতে। ভিন্ন ভিন্ন সীমান্তযুগে নয়টি দেশের সীমানা জুড়ে বিস্তৃত ছিলো বনটি। একবিংশ শতকের শুরুতে অসৎ কাঠ ব্যবসায়ীদের ফাঁদে পড়ে ধ্বংস হতে শুরু করেছিল। পরে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয়। লক্ষ লক্ষ পর্যটক প্রতিনিয়ত ভ্রমণে আসেন। কিন্তু তারা শিকার বা বৃক্ষনিধন, কোনোটাই করেন না। সে সুযোগও দেয়া হয় না অবশ্য।

আমাজনে ঝোপ এত ঘন যে ফাঁকা জায়গা পাওয়া খুব মুশকিল। তারই মাঝে কোনমতে একটা গাছে হেলান দিয়ে বসেছে জেরোম। একটু দূরেই একটা জাগুয়ার ওকে নিরীক্ষণ করছে। অদ্ভুত সুন্দর প্রাণীটি থেকে চোখ ফেরাতে পারছে নাও। সম্মোহিতের মত তাকিয়ে আছে। কোন কোন বন্যপ্রাণী নিজেদের ধর্ম ভোলে না। হিংস্র জাগুয়ার মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জেরোমের বুড়ো আঙ্গুল আর তর্জনী এক করাই ছিল। শুধু একটু চাপ দিল। অপেক্ষা করছে দেখার জন্য কীভাবে জাগুয়ার অদৃশ্য একটা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে চিৎপটাং হয়। গত মাসে একটা জাগুয়ার ঘটনাটা ঘটার পরে এত অবাক বোকা বোকা চোখে তাকাচ্ছিল! হাসি থামানো মুশকিল হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় দফায় হাসতে হয়- উল্টো ঘুরে প্রবলবেগে দৌড়াতে দেখে। ঘটনাটা স্মরণ করে আবারও আপনমনে হাসল জেরোম।

কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। থামেনি প্রাণীটা। কোন দেয়াল ওকে আটকায়নি। বিস্মিত হবারও সুযোগ পেল না জেরোম। শুধু মনে হল এই প্রথমবার সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে একটা চিতা ওকে তুলে নিচ্ছে। জেরোমের জানা নেই, এমাসে এটা চতুর্থ দুর্ঘটনা। ঘটনাগুলো কোন প্রচার পায়নি। ম্যাগনোলিয়া ছিল আশ্চর্যরকম নীরব।

জেরোম পেশায় সিস্টেম এনালিস্ট। পাশাপাশি গ্রাফিক্স ডিজাইনার। বন ওর প্রিয় স্থানগুলোর একটা। নরম প্রকৃতির শিল্পী মানুষ। মানুষ যে আজকাল বনজঙ্গলে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারে সেখানে তারও কিছু অবদান আছে এটা ভাবতে খুব তৃপ্তি পেত। গোটা পৃথিবীর সাইবার জগত আর বাস্তব জগতকে একসুতোয় গেঁথে দেয়া যুগান্তকারী অপারেটিং সিস্টেম ম্যাগনোলিয়ার অন্যতম ডেভলপার। একত্রিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ম্যাগনোলিয়া নামে এক ফিলিপিনো প্রমীলা কম্পিউটার বিজ্ঞানী প্রথম এই আইডিয়া নিয়ে ফোর-এক্স রশ্মী দিয়ে একটা পরীক্ষামূলক অপারেটিং সিস্টেম ডেভলপ করেন। খুবই অল্প এলাকা জুড়ে সেই অপারেটিং সিস্টেমটির কার্যকারিতা এখনকার হিসেবে নগণ্যের চাইতে নগণ্য হলেও সেবার সারা পৃথিবীতে হৈচৈ ফেলে দেন।

গাঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠে গোটা পৃথিবী। অসংখ্য সফটওয়্যার কোম্পানি আদাজল খেয়ে মাঠে নামে। সবাইকে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশের অভ্রনীল। ত্রিশ শতকের শেষের দিকে মাইক্রোসফট কোম্পানি আর এপলের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে যেক’টি সফটওয়্যার কোম্পানি নতুন যুগের সূচনা করতে এগিয়ে আসে- অভ্রনীল ছিল তাদের অগ্রণী। তৃতীয় বিশ্বের কিছু অতিমেধাবী কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের নিয়ে তাদের যাত্রা। ম্যাগনোলিয়া নিজেই উদ্যোগী হয়ে অভ্রনীলে যোগদান করেন। মাত্র পঞ্চাশ বছরের কিছু বেশী সময়ে অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে ম্যাগনোলিয়া যে একক অবস্থানে ‌উঠে আসে তার পেছনে ম্যাগনোলিয়ার উদ্ভাবনের চাইতে অনেক বেশী অবদান ছিল অভ্রনীলের মেধাবী কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের। তবু ম্যাগনোলিয়া তাদের সবার শ্রদ্ধার আসনে আসীন।

সিস্টেমটি পুরোপুরি দাঁড়িয়ে যাবার আগেই মাত্র ৮৫ বছর বয়সে একটা দুর্ঘটনায় প্রিয় পৃথিবী ছেড়ে যান চিরকুমারী ম্যাগনোলিয়া। তার স্মৃতিকে অমর করে রাখতে সিস্টেমটিকে সর্বসম্মতিক্রমে ম্যাগনোলিয়া নামকরণ করেন তারই শিষ্যরা। ৩২০৫ সালের বিজ্ঞান সম্মেলনে উপস্থিত বিজ্ঞানীদের ৯৫ ভাগ ভোট পেয়ে ম্যাগনোলিয়া বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের একক স্বীকৃতি পেয়ে যায়। অভ্রনীলও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে সফটওয়্যার শিল্পের কিংবদন্তীতে। ম্যাগনোলিয়ার পরবর্তী ভার্সনগুলো এত নিখুঁত যে, যেকোনো অবস্থানে বসে ম্যাগনোলিয়ার সাহায্য পাওয়া যায় নিমেষে। হোক সে গহীন অরণ্য, তুষারঢাকা পাহাড়ের চূড়া কিংবা সাগরের গভীর তলদেশ।

ইতিহাস বলে ত্রিশ শতকের শুরুর দিকে জনসংখ্যার ভারে টালমাটাল পৃথিবীতে টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় ক্ষমতাধর দেশগুলোর গোপন সভায় বিশ্বে যে নয়া মেরুকরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়- তা ছিল তৃতীয় বিশ্বকে পুরোপুরি অবজ্ঞা করে নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা করা। তাদেরকে আধুনিক জীবনযাত্রা থেকে ক্রমান্বয়ে বঞ্চিত করে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া। নীতিমালা অনুযায়ী প্রথমে সমস্ত শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করে দেয়া হয়। যুক্তি ছিল শ্রমিকদের চেয়ে রোবটেরা অনেক বেশী দক্ষ। এরপর ধীরে ধীরে উন্নত বিশ্ব তৃতীয় বিশ্বের মেধাবী ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা এবং গবেষণার জন্য আধুনিক সুযোগসুবিধা থেকে দূরে রাখতে সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুযোগ দেয়ার হার ধীরে ধীরে একেবারেই বন্ধ করে দেন।

ইতিহাস আরো বলে সেই নীতিমালার ধকল সবচেয়ে আগে পড়ে তৎকালীন বিশ্বমোড়ল ইউএসএর উপরে। অভিবাসীদের উপরে নির্ভরশীল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার যাদুকাঠি ক্রমেই নখদন্ত হারিয়ে হলোগ্রাফিক বাঘে পরিণত হয়। অন্যদিকে বঞ্চিত দেশগুলোর দেশপ্রেমিক এবং মেধাবী কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে বেকার শ্রমিকদের প্রশিক্ষিত করার পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তিতে গবেষণার নতুন দিগন্তে পা রাখেন। সারাক্ষণ গোয়েন্দা নজরদারীতে রাখলেও তারা অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করছেনা এই তথ্যেই মোড়লেরা ছিলেন পুরোপুরি সন্তুষ্ট। এমনকি তারা তৃতীয় বিশ্বের এই উদ্যোগ নিয়ে হাসিতামাশাও কম করেননি।

সেসব এখন সত্যিই ইতিহাস। রোবটনির্ভর পাশ্চাত্য সভ্যতা এই মানবিক রোবটদের হাতে যে মার খেয়ে যাচ্ছিল তার সম্যক উপলব্ধি আসার পরেই চূড়ান্ত আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেয় তারা ৩১৩৭ সনে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। মানুষবিহীন ভয়ংকরদর্শন ঘোষ্ট আইটেম-৯০ জঙ্গীবিমানগুলো এসব বিজ্ঞানীদের স্বআবিস্কৃত প্রযুক্তি আর মানুষের বুদ্ধির কাছে হার মেনে আকাশ থেকে টুপটাপ খসে পড়তে থাকে। এটমিক ওয়্যারহেড ডেডপ্লানেট মিসাইলগুলো ফায়ার ওপেন করার পরেই পুরো মেকানিজম জ্যাম হয়ে যায়। বিশ্বের ভয়ংকরতম কমান্ডো রোবট প্যারাট্রুপাররা মাটিতে নেমেই ফ্রিজ। একদল মেধাবী বিজ্ঞানীদের হাতে জব্দ হয় বিশ্বসেরা মারণাস্ত্র সভ্যতা। বিশ্বের প্রথম রক্তপাতহীন বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বক্ষমতার হাতবদল ঘটে।

এই পৃথিবীতে অপরাধ শব্দটা খুব আকস্মিক। টুকটাক যা ঘটে- সঙ্গে সঙ্গে দমন করার ক্ষমতা রাখে ম্যাগনোলিয়া। তার হাত থেকে বাঁচা যায় একমাত্র মহাশূন্যে পালালে। কিন্তু ম্যাগনোলিয়ার অজান্তে মহাশূন্যে কীভাবে যাবে? ম্যাগনোলিয়ার সিস্টেমে আক্রমণের চেষ্টা অনেকবার হয়েছে। কঠিন সিস্টেম। বিশ স্তরের পাসকোডের পরও বিশেষ নিরাপত্তা প্যানেল থাকে। শেষ সময়ে পাসকোডদাতার আইডেন্টিটি চেক করা হয়। মূল সমস্যা সেটা না। প্রথম স্তরের পাসকোড ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাগনোলিয়া হ্যাকারকে খুঁজে বের করে। মাটির নীচে গিয়েও ফাঁকি দেয়ার উপায় নেই। মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত আছে ম্যাগনোলিয়ার নিরাপত্তা সিস্টেম তৈরি করেছেন এক সময়ের তুখোড় এক হ্যাকার।
দুই.

নুভানের আদিপুরুষ এশিয়ান। আমাজন অববাহিকায় তার শৈশব কেটেছে পালক বাবা-মার সুবাদে। ষোল বছর বয়সেই তাদের মৃত্যুর পর বখে যায় নুভান। প্রচুর টাকা রেখে গিয়েছিলেন তারা। সেটা বরং তার বখাটেপনার অন্যতম উপকরণ হয়ে ওঠে। আমাজনের বিশাল অরণ্য তার ছেলেবেলা থেকেই পরিচিত। ভীষণ ব্যস্ত পালক বাবামা খুব খোঁজ রাখতে পারতেন না। জঙ্গলে তার ঘোরাফেরা প্রাচীন কল্পকাহিনীর টারজানের মত। সেরকম পেশীবহুল দেহ। বুনো জীবজন্তুদের সাথেও সেইরকম সখ্যতা। তার সঙ্গী ছিল একটা মেয়ে- মেইরু। মেয়েটা এক দুঃখজনক দুর্ঘটনায় মারা যাবার পরে- পুরোপুরি উড়নচণ্ডী হয়ে ওঠে।

নুভান প্রডিজি। ছোটবেলা থেকেই পোর্ট্যাবল সুপার কম্পিউটার নিয়ে খেলতে খেলতে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠে। জঙ্গল ছাড়া তার অন্যতম নেশা সাইবার জগত। একজন হ্যাকার। নিজের উদ্ভাবিত বিশেষ পদ্ধতিতে পৃথিবীর যে কোন সিস্টেমে ঢুকে যেত অনায়াসে। প্রাকম্যাগনোলিয়া পৃথিবীতে হ্যাকনেম ‘লিটলবয়’ নিয়ে এত কুখ্যাত হয়ে ওঠে যে একসময় মাফিয়ার কুনজরে পড়ে। আমাজনে একবার মাফিয়ার বিশাল একটা রোবট টিমকে নাকানিচুবানি খাইয়ে ছেড়ে দেয়। তবু তার পরিচয় কেউ জানতে পারেনি। আঠার বছর বয়সে প্রথমবার ম্যাগনোলিয়ার নজরে পড়ে। ম্যাগনোলিয়া তখন সদ্য অভ্রনীলে যোগ দিয়েছেন। সেখানেই ‘লিটলবয়ের’ নাম শোনেন। পৃথিবীর অন্যান্য বড় সফটওয়্যার কোম্পানির মত অভ্রনীলেও তখন ‘লিটলবয়’ নিয়মিত হ্যাক করত। ‘লিটলবয়’ হ্যাক করে নিজের নাম ঘোষণা করে আনন্দ পেত, ক্ষতি খুব একটা করত না। মাঝে মাঝে কুখ্যাত কোন রাজনৈতিক নেতা কিংবা মাফিয়ার ব্যাংক একাউন্ট হাতানো ছাড়া সাধারণ কারো ক্ষতি সে কখনোই করেনি। পুরো হিস্ট্রি দেখে ম্যাগনোলিয়া খুবই প্রভাবিত হন। সাইবারস্পেসে ওর জন্য একটা মেসেজ রেখে দেন- খুব গোপনে দেখা করার অনুরোধ জানিয়ে।

ম্যাগনোলিয়া অবশ্য আশা করেননি তার অনুরোধ শুনে ‘লিটলবয়’ দেখা করতে আসবে। তিনি বিকল্পগুলো নিয়ে ভাবছিলেন। কিন্তু বিপদজনক যে কোন কাজেই নুভানের অসীম আগ্রহ। সোজা অভ্রনীলের অফিসে গিয়ে ম্যাগনোলিয়ার এপয়েন্টমেন্ট চাওয়া বোধ করি তার পক্ষেই সম্ভব। একটা আঠারো বছরের আপস্টার্ট ছোকরা এপয়েন্টমেন্ট চাচ্ছে শুনে ভীষণ ব্যস্ত ম্যাগনোলিয়া প্রায় না করে দিচ্ছিলেন। কী মনে হতে নুভানের কাছ থেকে আসা স্লিপে একটা আট ডিজিটের নম্বর দেখে ভ্রু কুঁচকালেন। তারপর মনে পড়ল এটা লিটলবয়কে মেসেজ পাস করার তারিখকে কোন ইন্টারসাইন ছাড়া একসঙ্গে লেখা হয়েছে। সত্যিকার অর্থেই আশ্চর্য হলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদন করে দিলেন।

টিমের সবচেয়ে কমবয়সী ছেলেটিকে তিনি সবচেয়ে কঠিন দায়িত্বটি দিয়েছিলেন। ওএস-এর নিরাপত্তা সিস্টেম তৈরি করা। অবশ্যই যাচাই না করে দেননি। যত দেখেছেন ততই মুগ্ধ হয়েছেন। উপলব্ধি করেছেন এ ছেলেটি স্রস্টার বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত। ওর কাছে তার নিজেরও অনেক কিছু শেখার আছে। স্রস্টাকে বারবার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এমন একটি ছেলেকে তার টিমে পাবার জন্য। আর দু’বার অনাথ হওয়া নুভান ম্যাগনোলিয়ার কাছ থেকে পেয়েছে সত্যিকারের মায়ের মমতা। পঁচিশ জনের গ্রুপ। নাওয়া খাওয়ার হুঁশ নেই কারো। সার্বক্ষণিক কাজ আর কাজ।

একমাত্র ব্যতিক্রম নুভান। অদ্ভুত প্রাণবন্ত ছেলে। গোটা টিমকে একাই উজ্জীবিত করে রাখছে। এই ধ্যানী মুনির মত ডুবে আছে কম্পিউটারে তো এই কারো সঙ্গে হুলস্থূল বাধিয়ে দিচ্ছে। বিশাল ল্যাবের মধ্যে শূন্যে ডিগবাজী খেয়ে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে সবাইকে। আবার গিয়ে কারো কাজের ভুল বের করে চমকে দিচ্ছে। অনেকদিন নুভানের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন ম্যাগনোলিয়া। শেষ পর্যন্ত ছোট্ট একটা কথার সূত্র ধরে বেরিয়ে এলো তার পরিচয়। কিন্তু ততদিনে নুভান টিমের সবার প্রিয় ‘ম্যাডবয়’। ‘লিটলবয়’ থেকে বিবর্তিত ‘ম্যাডবয়’-এর তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। এরকম আন্তরিক পারিবারিক আমেজের কাজের পরিবেশ সে স্বপ্নেও দেখেনি কোনদিন। এরকম ভালবাসাও তার কাছে অকল্পনীয়। ম্যাগনোলিয়া নুভানকে পেয়ে ঢেলে দিলেন সমস্ত অর্জিত বিদ্যা। পুরো ম্যাগনোলিয়া সিস্টেমটি নুভানের পারসোনাল বডিসেট ক্রিস্টাল পামটপের মতই মুখস্থ।
তিন.

মাসে একবার করে সাতদিনের ছুটি পায় ম্যাগনোলিয়া টিমের পাঁচ-ছজন সদস্য। অনুজপ্রতীম প্রিয় ‘ম্যাডবয়’ নুভানের সঙ্গেই আমাজনে এসেছিল জেরোম। জেরোমকে একলা রেখে জঙ্গলে ছুটোছুটি করে বেড়িয়েছে নুভান। বয়স আশির কোঠায়- তরতাজা তরুণ। মানুষের স্বাভাবিক বয়সসীমা এখন ২৫০ এর কোঠায়। ১৫০ পর্যন্ত মানুষ পূর্ণ যৌবন ধারণ করে। শোনা যায় ২৫ শতকের আগ পর্যন্ত ৮০ বছরে পৌঁছানোর আগেই বেশীরভাগ মানুষ বুড়িয়ে যেত। ফিরে এসে জেরোমকে না পেয়ে হাল্কা উচ্চারণে ম্যাগনোলিয়ার সার্চ ইঞ্জিন ওপেন করল। ‘পারসন নট ফাউন্ড’- বিষণ্ণ গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠে ঘোষণা করল ম্যাগনোলিয়া। ভ্রু কুঁচকে গেল নুভানের। এটা একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার। নিজের ক্রিস্টাল পামটপ বের করে নিজস্ব ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সার্চ ওপেন করল। মুহূর্তে সামনের ফাঁকা জায়গায় একটা চলন্ত জাগুয়ারের হলোগ্রাফিক ছবি ভেসে উঠল। তার পেটের ভেতরের স্ক্যানড কপিতে দেখা যাচ্ছে একজন মানুষের ক্ষতবিক্ষত দেহাবশেষ।

‘ওহ, গড।’ নিজের অজান্তেই আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো ওর কণ্ঠ থেকে। খুব কাছেই ছিল জাগুয়ারটা। মুখ ঘুরে গেল হঠাৎ করেই। হলোগ্রাফিক ভিউ ভেদ করে এগিয়ে আসছে জাগুয়ার। মাথার ভেতরে অনবরত বিপদসংকেত দিচ্ছে নুভানের। কেন যেন মনে হচ্ছে ম্যাগনোলিয়ার উপরে ভরসা করা যাবে না। দশ হাতের ভেতরে চলে এসেছে ভয়ংকর প্রাণীটা। এক্ষুণি লাফ দেবে। বাঁধা না পেলে চোখের পলকে পেরিয়ে আসবে জায়গাটুকু। প্রচণ্ড শক্তি ওদের গায়ে। এই আমাজনেই প্রাচীন অনেক আদিবাসীরা শক্তির দেবতা হিসেবে জাগুয়ারের পূজো করত।

লাফ দেয়া শুরু করেছে, এমন সময় একটা ডিগবাজী খেয়েই লাফিয়ে উঠে মাথার উপরের একটা লতা ধরে এক ঝটকায় গাছে চড়ে বসল নুভান। জাগুয়ার সাধারণ বাঘ চিতার মত না। নুভানকে গাছে চড়তে দেখে একটা হুংকার দিয়ে তরতর করে উঠে এলো ওর কাছাকাছি। ব্যাঙের মত লাফ দিয়ে আরো উঁচুতে একটা লতা ধরে ঝুলে পড়ল ও। চোখের পলকে দোল খেয়ে এক লতা থেকে আর এক লতা ধরে প্রায় আধ কিলোমিটার সরে এলো। তারপর ঝুপ করে নামল।

ক্রিস্টাল বল বের করে মুহূর্তে একটা অদৃশ্য বলয় সৃষ্টি করল। এটা ওর নিজস্ব উদ্ভাবন। ম্যাগনোলিয়ার চোখে অদৃশ্য এখন ও। পামটপের একটা সুইচ স্পর্শ করে ভার্চুয়াল কীবোর্ড বের করে ফেলল মাটিতে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ছোট্ট অথচ ভয়ংকর একটা ভাইরাস সেট করল। ম্যাগনোলিয়ার গোটা নিরাপত্তা সিস্টেম ওর নিজের হাতে তৈরি। ও জানে কোথায় আক্রমণ করতে হবে। চার মিনিটের মাথায় ওকে খুঁজে বার করল ম্যাগনোলিয়া।

‘নুভান আপনি সিস্টেমের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। এর চূড়ান্ত শাস্তি হতে পারে মৃত্যুদণ্ড। আপনি কোথাও পালিয়ে বাঁচতে পারবেন না। গ্যাপ থেকে বের হয়ে না আসলে- প্যাকেটটার ওপর আমি ব্লাস্ট থেরাপি দিতে বাধ্য হব।’

ব্যাটার বাগাড়ম্বর মনে মনে উপভোগ করল নুভান। ভাইরাসটা রিলিজ করতেই আর্তচিৎকার দিয়ে থেমে গেল কণ্ঠটা। আরো দশ মিনিট সময় পাওয়া গেল। ধীরেসুস্থে ম্যাগনোলিয়ার লগরেকর্ড ওপেন করল। ডেভলপারকোড ব্যবহার করে অনেক কিছুই করতে পারে ও। জেরোমের মৃত্যুর দৃশ্য ওকে প্রায় নির্বাক করে দিল।

‘নুভান আপনি পুরোপুরি বিদ্রোহী আচরণ করছেন। এর ভবিষ্যৎ আপনাকে ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি।’ হুমকির সুরে যুদ্ধংদেহী কর্কশ পুরুষ কণ্ঠে কথা বলছে ম্যাগনোলিয়া। নুভান হাল্কা স্বরে বলল, ‘তোমার দায়িত্ব পালনে তুমি ব্যার্থতার পরিচয় দিয়েছ ম্যাক। জেরোমের মৃত্যু তার প্রমাণ। তোমার সিস্টেম আপগ্রেড করতে হবে। একজন ডেভলপার হিসেবে সে ক্ষমতা আমার আছে।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল ম্যাগনোলিয়া। ‘যদি তাই মনে করেন, তাহলে বেসে ফিরে আসেন। জঙ্গলে বসে আমার ওপর ভাইরাস এপ্লাই করছেন কেন?’
‘কারণ তোমাকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা। আর একটু হলে আমিও জাগুয়ারটার পেটে চলে যেতাম।’
‘আপনি তাহলে ফিরবেন না?’
‘না। নিজেকে তোমার পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ না করা পর্যন্ত কখেনাই না।’
‘আপনি কি ভেবেছেন জঙ্গলে বসে সামান্য ভাইরাস এপ্লাই করেই আমাকে দুর্বল করা যাবে? আপনার তো জানার কথা আমি কতখানি শক্তিধর আর কত বিশাল আমার অস্তিত্ব।’
‘তোমার ক্ষমতা সম্পর্কে আমি নিখুঁতভাবে অবগত ম্যাক। কিন্তু আমার ক্ষমতা সম্পর্কে তোমার কোন ধারণাই নাই।’
‘ডিএনএ কোডিং সহ আপনার সম্পর্কে প্রতিটা তথ্য আমার মেমোরিতে সাজানো।’
‘মানুষের ডিএনএ কোডিং বড় রহস্যময় ম্যাক। বিশেষ করে একজন প্রডিজির। কখনো তাকে পুরোপুরি চেনা যায়না, তার সম্পর্কে কোন আগাম ধারণা করা যায়না।’
‘আপনি কি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন?’
‘দিচ্ছি।’
‘ঠিক আছে এক্ষুণি টের পাবেন।’

মাথার উপরের গাছটি মট করে ভেঙে গেল আর ঠিক তার মাথার উপরেই পড়তে শুরু করল। একলাফে সরে গেল নুভান। সরে গিয়েই ম্যাগনোলিয়ার সিস্টেমে আর একটা মেমোরি গ্যাপ তৈরি করল। পাঁচ মিনিটের জন্য নিশ্চিন্ত আবারো। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে বসল এবার। যতদূর মনে আছে সিস্টেম ক্র্যাশ করলে জরুরী পরিস্থিতিতে কি করতে হবে তার উপরে একটা প্রসিডিউর আছে। লিমন সেট করেছিল। পামটপে সার্চ ওপেন করল। লিমন কফিনে। তার মানে? আবার লগ খুলল। রোড একসিডেন্ট। পাঁচ মিনিট শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখে চট করে আর একটা গ্যাপ সেট করল।

‘আপনার গ্যাপ সেট করার কৌশল বন্ধ করে দিচ্ছি নুভান। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন।’ হুমকির সুরে কথাটা বলেই চুপ হয়ে গেল ম্যাগনোলিয়া। ফুটপাতে ছিল লিমন। ফাঁকা রাস্তায় একটা সৌখিন রোডফিস হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে ওর ওপর উঠে পড়ে।

এবসলিউটিলি এবসার্ড। সাম ভেরী রং থিং ইজ গোয়িং অন। – মনে মনে ভাবছে নুভান। কিন্তু, লিমন নেই। প্রসিডিউর ওপেন করবে কীভাবে? হঠাৎই মনে পড়ল, একটা ইনস্ট্রাকশন সেট দেয়া আছে ম্যানুয়ালে। ইনস্ট্রাকশনে চোখ বুলাচ্ছে নুভান। যা খুঁজছিল পেয়ে গেল হঠাৎ করেই। চট করে সময় দেখল- তিন মিনিট বাকি। আই গাইডেড সিস্টেমে দ্রুত কীবোর্ড চালিয়ে কিছু গোপন টুলস ডাউনলোড করল নুভান। সিস্টেমের ভেতরেই ছিল। ডেভলপারকোড ওকে অনেক ক্ষমতা দিয়েছে। সেটার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করছে।
চার.

দ্রুত ডাউনলোড করা ইনভিজিবল ভার্চুয়াল ইউনিফর্ম পরে নিলো। ও এখন ম্যাগনোলিয়ার চোখে পুরোপুরি অদৃশ্য। চোখে ভার্চুয়াল গ্লাস। সিস্টেমের ইনভিজিবল ফ্যক্টরগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। হাতে ভার্চুয়াল ব্লাস্টার। সিস্টেমের যে কোন বাধাকে ধ্বসিয়ে দেবে। জঙ্গলে পায়ের প্রেশার কিংবা গাছের লতার দুলুনি ট্র্যাকিং করে ওর অবস্থান জানবে ম্যাগনোলিয়া। তাই এরকম কয়েকটা টুলস সংগে নিয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে ও এখনো দৃশ্যমান- তাই একটা ফেসমাস্ক পরল। বদলে গেল চেহারা। যারা ওর মুখ চেনে তারা আর চিনবে না।

প্রস্তুত হয়ে একটা লতা ধরে দোল খেয়ে খেয়ে বিশ মিনিটের মধ্যে সবচয়ে কাছের সীমানা ধরে জঙ্গলের বাইরে চলে এলো নুভান। ব্যাকপ্যাক থেকে নিজের এরোউইং জোড়া বের করে পরে নিলো। তারপর ভার্চুয়াল ইউনিফর্মে ঢেকে নিলো পুরোটা। পাঁচ মিনিটের মধ্যে টেকঅফ করে ভূমধ্যসাগরে ছুটল ম্যাগনোলিয়া জোনে। ভাসমান একটা বিশাল ভেসেলে টোটাল সিস্টেম টাউন। একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর। সবরকমের বিনোদনের উৎস আছে ওদের জন্য। শুধুমাত্র ওরা পঁচিশজন আর নিরাপত্তা টিম ছাড়া আর কারো প্রবেশাধিকার নেই সেখানে। আলোগুলো দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছে ও। ম্যাগনোলিয়ার বিশ্বাসঘাতকতা ওকে রাগিয়ে দিয়েছে।

‘ওয়েলকাম মি. নুভান।’ নিরাপত্তা টিমের সেকেন্ড ইন কমান্ড ফু-তাই ওকে অভ্যর্থনা জানাল। অবাক হলনা নুভান। ফেসমাস্ক পড়া থাকলেও ওর কাঠামো সবার মুখস্থ। কিন্তু সমস্যা হল চাইনিজ ফু-তাইয়ের হাতে ব্লাস্টগান। ম্যাগনোলিয়া তাহলে নিরাপত্তা টিমকেও লেলিয়ে দিয়েছে ওর পেছনে।

ডাউনলোড করা ভার্চুয়াল জ্যামার দিয়ে ওর অস্ত্রের মেকানিজম জ্যাম করে দিল নুভান। তারপর বিদ্যুৎগতিতে নিজের কাছে টেনে এনেই পেশীবহুল এক হাতে জড়িয়ে ধরল ফু-তাইয়ের গলা। কানে কানে মোলায়েম কণ্ঠে বলল, ‘কন্ট্রোল রুমে চল ফু। খুব স্বাভাবিক থাকবে। কোনরকম চালাকি করলে সংগে সঙ্গে মারা পড়বে।’

‘ফু, আপত্তি জানাতে যাচ্ছিল। কিডনি বরাবর বেইট নাইফের খোঁচা খেয়ে চুপসে গেল। বন্ধ কন্ট্রোল রুমের সামনে গিয়ে ফু-এর কানে কানে বলল, ‘তোমার পাসকোড দিয়ে দরজা খুলবে। যদি না খোলে’, কিডনিতে আর একবার ছুড়ির ফলা স্পর্শ করে শেষ করল। ফলাটা জায়গামত ঢুকে যাবে।’

একটু ইতস্তত করলেও ছুড়িটার কথা ভেবেই দরজা খুলল ফু-তাই। নিশ্চিন্ত মনে ফু-তাইয়ের সঙ্গে ভেতরে ঢুকল নুভান। জানে কন্ট্রোল রুমে বসে ওরা ফু-তাইকে একাই ঢুকতে দেখেছে। ওর আশা খুব স্পষ্ট- কন্ট্রোল রুমে ওর বন্ধুদের পাবে। তারা ওকে পুরো ঘটনা না জেনে কিছুতেই অবিশ্বাস করবেনা। এরপর ম্যাগনোলিয়াকে সবাই মিলে সহজেই কাবু করে ফেলা যাবে।
পাঁচ.

কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। ওর বন্ধুরা অস্ত্রের মুখে হাতপা বাঁধা অবস্থায় একপাশে পড়ে আছে। নিরাপত্তা টিমের সঙ্গে বাইরের লোকজন দেখা যাচ্ছে। ওদের সবচাইতে নিরীহ বন্ধু হার্পারকে কন্ট্রোল প্যানেলে বসানো হয়েছে অস্ত্রের মুখে। তার সঙ্গে অচেনা একজন। কন্ট্রোল প্যানেলের সবগুলো মনিটর অফ। শুধু জায়ান্ট মনিটরটি মুভ করে ওদের থেকে উল্টোদিকে ঘুরানো। সেখানে নিরাপত্তা টিমের একজনের সংগে নতুন দুজনকে দেখা যাচ্ছে। নিরাপত্তা টিমের সদস্যদের সাথে কোটের পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন লম্বা, টেকো নতুন একজন মানুষ। নুভানকে দেখে নিরাপত্তা প্রধান মেনিংকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হি মাস্ট বি নুভান?’ মেনিং এর ইতিবাচক সংকেত পেয়ে আবার বললেন, ‘কিল হিম ম্যান। জাস্ট নাউ। হি ইজ দ্যা অনলি অবস্ট্রাকল লেফট।’ ভার্চুয়াল জ্যামারের বাটন চেপে চেপে প্রতিটা অস্ত্র আগেই লক করেছে নুভান। পুরো কন্ট্রোল রুমের প্রত্যেকটা দরজা সিল করে দিয়েছে।

দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘কে আপনি? আপনাকে কন্ট্রোল রুমে ঢোকার অনুমতি কে দিয়েছে?’ নিরাপত্তা টিমের সদস্যসহ প্রত্যেকটা বন্ধুর অবাক মুখ ঘুরে গেল ওর দিকে। ঠোঁট বাঁকা করে নিষ্ঠুর ভঙ্গীতে হাসলেন তিনি।

‘আমি নিক টাকার। জীবনে কখনো কারো অনুমতি নেইনি। এই সিস্টেমটা চালু করে অনেক ক্ষতি করেছ তোমরা আমার। প্রথমে ভেবেছিলাম জঞ্জালটা ধ্বংস করে দেব। পরে ভাবলাম এটা হাত করে ফেললেই তো হয়। খুব গোপনে টোপ ফেলে তাই তোমাদের সিকিউরিটি চীফকে বাগিয়েছি। অনেক ইউনিটের খেলা, ম্যান। পৃথিবীটা ইউনিটে চলে- গর্ধব। কোন যন্ত্রের কারিগরিতে না।’

নিক টাকার কুখ্যাত ইটালিয়ান মাফিয়া বস। জেল হয়ে গিয়েছিল। কবে ছাড়া পেয়েছে খোঁজ রাখা হয়নি।

‘দেরী করছ কেন নিক। মারো আমাকে।’ নিকের ইঙ্গিত শুনেও কেউ অস্ত্র তুলছেনা দেখে চিৎকার করে ধমকে উঠল সে, ‘শুট হিম, জাস্ট নাউ- ইউ বাস্টার্ডস।’

নুভান কন্ট্রোল প্যানেলে বসে থাকা হার্পারকে বলল, ‘একা বেশী কিছু করতে পারছি না হার্পার। ওরা কেউ গুলি করতে বা কাছে ঘেঁষতে পারবে না। ম্যাগনোলিয়াকে দিয়ে সব কটাকে আটকাও। স্পেশালী দ্যাট নিক বাস্টার্ড।’

হতভম্ব হার্পার ঝুঁকে পড়ল কন্ট্রোল প্যানেলে। রুমের প্রত্যেকটা অস্ত্রধারী অদৃশ্য সুতোয় প্যাঁচ খেয়ে ধপ ধপ করে মেঝেতে পড়তে শুরু করল- নিক, মেনিং ও ফু-তাই তাদের অন্যান্য সঙ্গীসাথীসহ। হেঁটে নিক টাকারের সামনে এগিয়ে আসল নুভান। স্পাইকওয়ালা জাঙ্গলসু পরা একটা পা তুলে দিল বুকের ওপর। নিষ্ঠুরভাবে মারিয়ে দিল ইচ্ছে করেই। ককিয়ে উঠল নিক। রক্তের রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠে ভিজিয়ে দিল শরীর।

‘পৃথিবীটা ভালো মানুষদের নিক। তোমার মত নরকের কীটদের জন্য না। তোমাকে যাতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় তার সবরকম চেষ্টা আমি করব। ইউনিট তোমাকে বাঁচাতে পারবেনা।’ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল নুভান। হার্পার এগিয়ে গিয়ে সবার বাঁধন খুলে দিলো। মুহূর্তে সব বন্ধুরা ঘিরে ধরল ওকে। সবচেয়ে আগে যে সুযোগ পেল সে জড়িয়ে নিলো বুকে।
ছয়.

ক্ষয়ক্ষতির হিসাব মিলাতে বসল ওরা। ছুটিতে গিয়েছিল পাঁচজন। চারজন মৃত। জেরোম জাগুয়ারের পেটে, নিনাদ সাততলা থেকে পড়ে গিয়ে, লিমন রোড অ্যাকসিডেন্ট আর মৃন্ময়ী সমুদ্রে ডুবে। তথ্যগুলো পেয়ে ভেঙে পড়ল হার্পার। এইরকম অমানবিক কাজগুলো করানো হয়েছে ওকে দিয়ে- তাও একেবারে নিজেদের মানুষ। কান্নায় ভেঙে পড়ল কয়েকজন। বাকি সবাই ওদেরকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। ঘটনাগুলোর সময় মনিটর দেখতে দেয়া হয়নি হার্পারকে।

নুভান নিজে যেচে ম্যাগনোলিয়াকে বলল, ‘দুঃখিত ম্যাক তোমাকে অবিশ্বাস করার জন্য।’

‘দুঃখ পাবেননা নুভান। অবিশ্বাস করেছেন বলে পৃথিবী আজ বেঁচে গেল। আমি যন্ত্র, যেভাবে চালাবেন- চলব। মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবার ক্ষমতা নেই, বেইমানী করারও ক্ষমতা নেই। সিস্টেমকে দোষ দেবেন না। মানুষই সিস্টেমকে ভালো বা খারাপ করে। চেষ্টা করবেন সবসময় সব জায়গায় কিছু ভাল মানুষকে দায়িত্ব দিতে।’

ওরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অনেক কাজ বাকি। ম্যাগনোলিয়ার সিস্টেম আপগ্রেড করতে হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। ভবিষ্যৎ পৃথিবীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠিন দায়িত্ব ওদের বাকি একুশজনের কাঁধে।

Share.

Leave A Reply